ইসলামী ব্যাংকে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ৮৫৪২ নিয়োগ, পটিয়ারই ৫১৪৮ জন
এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে সুনির্দিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ৮ হাজার ৫৪২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেওয়া এসব নিয়োগের মধ্যে ৫ হাজার ১৪৮ জনই চট্টগ্রামের পটিয়ার বাসিন্দা। ওই সময়ে ব্যাংকে মোট নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ হাজার ৮৩২ জনকে।
এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ কিংবা লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। আর নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় একটি অংশই চট্টগ্রামের, বিশেষ করে ‘এস আলম গ্রুপে’র প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের জন্মস্থান পটিয়ার বাসিন্দা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিদর্শনে এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। পরিদর্শন প্রতিবেদনটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকে মোট কর্মী ছিলেন ২১ হাজার ৫৫১ জন। এর মধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ওই বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ হাজার ৮৩২ জনকে। ওই সময় ব্যাংকটি এস আলমের নিয়ন্ত্রণে ছিল। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ৪৬৬ জন লেটারাল এন্ট্রির মাধ্যমে এবং ১০ হাজার ৩৩৬ জন সরাসরি প্রবেশ পর্যায়ে নিয়োগ পান।
ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী, বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য কমপক্ষে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিধান ছিল। আবেদন করার জন্য অন্তত ১৫ দিন সময় দেওয়ার পাশাপাশি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হতো। উভয় পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়া ছিল ন্যূনতম যোগ্যতা।
কিন্তু ২০১৭ সালে ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তনের পর এ প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় ঘটে। ওই সময় ৮ হাজার ৫৪২ জনকে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে নিয়মসিদ্ধ করতে ওই সময়ে ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়। নীতিমালার ৭.০৪ ধারায় বলা হয়, ‘জরুরি প্রয়োজন’ দেখা দিলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জনবলের প্রয়োজন অনুযায়ী এন্ট্রি লেভেল ও লেটারাল এন্ট্রি গ্রেডে কর্মী নিয়োগ দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কিছু আনুষ্ঠানিকতা শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়।
তবে এই পরিবর্তনের মাধ্যমে মূল নিয়োগবিধির ৭.০১ ধারা উপেক্ষা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই ধারায় কমপক্ষে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং প্রার্থীদের আবেদন করার জন্য অন্তত ১৫ দিন সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যাংকের কার্যক্রম সচল রাখতে সাধারণত সীমিতসংখ্যক লেটারাল এন্ট্রি বা বিশেষায়িত কারিগরি পদে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকে সেই বিধান ব্যবহার করে প্রবেশনারি পর্যায়েই ছয় হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা অস্বাভাবিক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই সময় ইসলামী ব্যাংকে বড় ধরনের জনবল সংকট ছিল— এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি। বরং বিজ্ঞপ্তি ছাড়া যে বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়, তা ব্যাংকের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ছিল বলে সে সময়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এস আলমের নিয়ন্ত্রণকালে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ৮ হাজার ৯৯ জন। এর মধ্যে ৫ হাজার ১৪৮ জনই পটিয়ার বাসিন্দা। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের প্রার্থীদের আবেদন ও প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। ফলে চট্টগ্রাম থেকে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী নিয়োগ পাওয়ায় ব্যাংকে একটি কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছে, প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহের জন্য এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাড়ি এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ কার্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের বাক্স রাখা হতো। এসব বাক্সে ‘পটিয়া জেনারেল’, ‘পটিয়া ক্যাশ’, ‘পুরুষ জেনারেল-সাতকানিয়া-লোহাগাড়া’, ‘পুরুষ ক্যাশ-গন্ডামারা-বাঁশখালী’, ‘মহিলা-ক্যাশ’, ‘নারী’ ও ‘ডিপ্লোমা’সহ বিভিন্ন পরিচয় লেখা থাকত। এসব বাক্সে জমা পড়া সিভি থেকে পছন্দের প্রার্থীদের ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হতো। এরপর প্রধান কার্যালয় থেকেই নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের ২৬টি প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচের মধ্যে ২৪তম ব্যাচের নিয়োগেও নিয়ম মানা হয়নি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ব্যাচের নিয়োগে কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। ২০১৯ সালের শুরুতে চট্টগ্রাম থেকে ৮৪০ জন প্রার্থীর তালিকা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে তাদের লিখিত পরীক্ষা নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ। পরীক্ষায় অংশ নেন ৭৬৩ জন।
ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী পাস নম্বর ছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু তা অর্জন করতে পারেন মাত্র ৩৬ জন। এরপর পাস নম্বর কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। এতে ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৩০৪ জন।
এ ছাড়া লিখিত পরীক্ষা না দিয়েই আরও ১২ জনকে শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করা হয়। পরে তালিকার প্রথম ১৭৮ জন এবং লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া ১২ জনসহ মোট ১৯০ জনকে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাকি ১২৬ জনকে পাঠানো হয় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে। সবাই ছিলেন চট্টগ্রামের বাসিন্দা। ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ পাওয়া ১৯০ জনের মধ্যে ১৮৪ জন পরে চাকরিতে যোগ দেন।
২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আরও কয়েকটি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও নিয়ম মানা হয়নি। এ সময়ে ২ হাজার ২৩২ জন ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (জেনারেল), ২ হাজার ৮২৮ জন ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) এবং ৫০১ জন ট্রেইনি জুনিয়র অফিসারকে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সময়ে লেটারাল এন্ট্রির মাধ্যমে ৪৬৬ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ২৬৪ জনই চট্টগ্রাম জেলার প্রার্থী।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি যুক্ত থাকে না। এটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিজস্ব বিষয়। তবে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ভূমিকা পালন করে। তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর অনিয়ম পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও নির্দেশনা দেওয়া হবে।
ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন অনিয়ম তদন্তে চারটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ নিরীক্ষার দায়িত্ব দেয়। সেই নিরীক্ষাতেও এস আলমের সময়কার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বহিঃনিরীক্ষা প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
এই পরীক্ষা বন্ধের দাবিতে দুই কর্মী হাইকোর্টে রিট করেন। পরে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, পরীক্ষা আয়োজনে কোনো বাধা নেই। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা নেয় ইসলামী ব্যাংক।
ইসলামী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৫ হাজার ৩৭৩ কর্মকর্তার মধ্যে ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন। অংশগ্রহণকারী সবাই উত্তীর্ণ হন এবং চাকরিতে বহাল থাকেন। অন্যদিকে ৪ হাজার ৯৭২ জন কর্মকর্তা পরীক্ষায় অংশ নেননি।
ব্যাংকটির অভিযোগ, তাদের কয়েকজন পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহী কর্মীদের শারীরিকভাবে হেনস্তা করেন এবং ভয়ভীতি ও হুমকি দেন। পাশাপাশি কর্মবিরতি, সড়ক বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগও ওঠে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব কর্মকাণ্ডকে শৃঙ্খলাভঙ্গ ও নীতিমালাবিরোধী হিসেবে বিবেচনা করে। পরিচালনা পর্ষদের পরামর্শ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরে মানবসম্পদ নীতিমালা অনুসারে ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে তিন মাসের বেতন পরিশোধ করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসাইন বলেন, ওই কর্মীদের নিয়োগ বৈধ না অবৈধ— শুধু এই বিবেচনায় তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়নি। তিনি বলেন, যে প্রক্রিয়ায় তারা নিয়োগ পেয়েছিলেন, সেখানে সার্ভিস রুল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করা হয়নি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া পূর্ণ করার সুযোগ হিসেবে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু তারা পরীক্ষায় অংশ নেননি এবং অন্যদেরও পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধা দিয়েছেন। ফলে ব্যাংকের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করায় তাদের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিদ্ধান্তের আওতায় দেখেছে বলে জানান তিনি।