রাত হলেই পানি বিপৎসীমার ওপরে, তিস্তা-ধরলার পারে নির্ঘুম রাত
নির্ঘুম রাত কাটছে তিস্তা ও ধরলা নদীর শতাধিক চরের মানুষের। রাতে পানি হু হু করে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ভোরের আলো ফুটতেই কমতে থাকে। চরবাসীর অভিযোগ, ভারতের গজলডোবা বাঁধের কারসাজিতেই এ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে তাদের।
লালমনিরহাট জেলার দুই পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আসছে তিস্তা ও ধরলা নদী। নদীপারের বাসিন্দারা বলছেন, উজানের পাহাড়ি ঢল ও রাতের ভারী বৃষ্টিপাতে দুটি নদীই উম্মাদের মতো আচরণ করছে।
সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ৬টায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেকর্ড অনুয়ায়ী, তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সকাল ৯টায় তা বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচে নেমে আসে। দুপুর ১২টায় তা ৫ সেন্টিমিটার ও বিকেল ৩টায় ১১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে সন্ধ্যা ৬টার পর ভারতের গজলডোবা বাঁধ থেকে পানি ছাড়লে তিস্তা আবার বিপজ্জনক হয়ে উঠবে বলে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মহিষখোচায়তিস্তা নদীর মধ্যচরের বাসিন্দা মোখলেছ উদ্দিন বলেন, রোববার দিবাগত রাতে দুই চোখের পাতা এক করতে পারিনি। সোমবার ভোরে হঠাৎ তিস্তা নদীর পানি ভয়ংকরভাবে শোঁ শোঁ শব্দ করে প্রবাহিত হতে শুরু করে। অনেকের ঘরে পানি উঠে যায়। চরে চরে কান্নার রোল পড়ে যায়। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
মোখলেস আরও বলেন, সকলে প্রাণ বাঁচাতে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেয় সবাই। তখন কেবল সকালের আলো ফোটার অপেক্ষা করছিলাম। সকালে যখন সবাই আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এমন সময় পানি কমতে থাকে।
এলাকাবাসী বলছে, গজলডোবা ও তিস্তা ব্যারেজের পানি ছাড়ার খবর মাইকিং করে প্রচার করা হতো। এমনকি স্থানীয় রেডিও ও পত্রপত্রিকায় খবর প্রচার করা হতো। ২০১১ সালের পর তিস্তা ও ধরলা নদী নিয়ে ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তি না হওয়ায় এখন আর ভারত সরকার আগে থেকে পানি ছাড়ার খবর দেয় না। এখন পানি ছাড়ার খবর প্রচারও করা হয় না, যা তাদের সমস্যায় ফেলেছে।
গোর্বধন গ্রামের মরিয়ম বেগম বলেন, আগে আমরা খবর পেতাম কবে পানি ছাড়বে। এখন কোনো খবর দেয় না। আগে খবর পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেত। এখন ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানো যায় না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা বলেন, তিস্তা নদী নিয়ে এখন ভারতের সঙ্গে পানি চুক্তি নেই। আগে নিয়মিত বাংলাদেশ-ভারত জিআরসি বৈঠক হতো। এখন সে বৈঠকও বন্ধ। আমরা ইন্টারনেট, দেশি-বিদেশি ওয়েবসাইট ও ভারতের ওয়েবসাইট থেকে তথ্য নিয়ে পানির অবস্থান নিশ্চিত হয়ে যতটা পারি ব্যবস্থা নেই।
চরাঞ্চলের একজন স্কুলশিক্ষক জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড সকাল ৬টা, সকাল ৯টা, দুপুর ১২টা, বিকেল ৩টা ও সন্ধ্যা ৬টায় পানির রেকর্ড সরকারিভাবে পরিমাপ করে থাকে। সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে রাতের কোনো সময় পানি পরিমাপ করে না। ভারতের গজলডোবা কর্তৃপক্ষ এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে থাকে। রাতে হু হু করে পানি ছাড়ে। পরিমাপ করায় না তা বোঝা যায় না। রেকর্ড না থাকায় প্রতিবাদ করা যায় না। কষ্ট পায় চরবাসী।
খরস্রোতা তিস্তায় পানি কমতে ছয় থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগে। এলাকাবাসী বলছেন, পানি কুড়িগ্রামে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে পড়ে। কিন্তু এরই মধ্যে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা ও নীলফামারীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলের দুই কূলের ঘরবাড়ি, ফসল, গাছপালা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। যখন ধরলা ও তিস্তা নদীর পানি কমতে থাকে, তখন আবার দেখা দেয় ভয়াবহ নদীভাঙন।
এলাকাবাসী ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে তিস্তা ও ধরলা পাড়ের কয়েক শ পরিবার। এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে হাতীবান্ধা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের দুই শতাধিক বসতভিটা। সদর উপজেলার মোগলহাটের ফলিমারী চরে ধরলা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা ও বাড়িঘর। হুমকির মুখে রয়েছে বিদ্যালয়, মসজিদ ও মাদরাসা।
শুকনো মৌসুমে তিস্তা নদী শুকিয়ে যায়। চওড়ায় খালের আকারে নেমে আসে। বর্ষায় তা ১২ থেকে ১৪ কিলোমিটার প্রশস্ত হয়ে ওঠে জায়গায় জায়গায়। একই অবস্থা ধরলা নদীরও।