কেন প্রয়োজন প্রকৃত সাংবাদিকদের একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ?

Shahinur Rahman Uzzol
Shahinur Rahman Uzzol Shahinur Rahman Uzzol
প্রকাশিত: ১১:৩০ অপরাহ্ন, ২০ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৭:৩৩ অপরাহ্ন, ২১ এপ্রিল ২০২৬


​বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের যুগে সংবাদ মাধ্যম সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করলেও, এই দর্পণে এখন ধুলো জমছে ‘অপসাংবাদিকতা’র কারণে। অলিগলি থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যন্ত সর্বত্র আজ ‘সাংবাদিক’ পরিচয়ের ছড়াছড়ি। কিন্তু এই ভিড়ের মধ্যে প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিক কারা, আর কারা ব্যক্তিগত স্বার্থে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করছে, তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র কার্যকর পথ হলো প্রকৃত সাংবাদিকদের একটি সমন্বিত ও কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা।

​কেন এই ডাটাবেজ সময়ের দাবি?

​সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা হলেও বর্তমানে এর অপব্যবহার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ কেন জরুরি, তার প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  • ভুয়া সাংবাদিক শনাক্তকরণ: বর্তমানে একটি স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই অনেকে নিজেকে সাংবাদিক দাবি করছেন। প্রেস স্টিকার বা ভুয়া আইডি কার্ড ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার ঘটনা নিত্যদিনের। ডাটাবেজ থাকলে যে কেউ তাৎক্ষণিকভাবে সাংবাদিকের পরিচয় যাচাই করতে পারবে।
  • পেশাদারিত্বের মানদণ্ড নির্ধারণ: সাংবাদিকতা শুধু ছবি তোলা বা ভিডিও করা নয়; এর নির্দিষ্ট নীতিমালা ও নৈতিকতা রয়েছে। ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্তির জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত থাকলে কেবল প্রকৃত শিক্ষিত ও দক্ষ ব্যক্তিরাই এই পেশায় টিকে থাকতে পারবেন।
  • নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিশ্চিতকরণ: প্রকৃত সাংবাদিকরা প্রায়ই পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলা বা মামলার শিকার হন। একটি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক ডাটাবেজ থাকলে সংকটের সময় তাদের আইনি সহায়তা প্রদান এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা (যেমন: অনুদান, স্বাস্থ্যসেবা) নিশ্চিত করা সহজ হবে।
  • সংবাদ মাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার: অপসাংবাদিকতার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের ওপর থেকে আস্থা উঠে যাচ্ছে। প্রকৃত সাংবাদিকদের তালিকা প্রকাশিত থাকলে পাঠকরা তথ্যের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবেন।

​ডাটাবেজ যেভাবে অপসাংবাদিকতা রোধ করবে

​একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ কেবল নামের তালিকা নয়, এটি হতে পারে অপসাংবাদিকতা রোধের প্রধান অস্ত্র:

​১. জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: যদি কোনো সাংবাদিক অপসাংবাদিকতা বা নীতিবহির্ভূত কাজে লিপ্ত হন, তবে ডাটাবেজ থেকে তার নাম বাদ দেওয়ার বা লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা থাকলে এই প্রবণতা কমে আসবে।

২. তথ্য প্রাপ্তিতে সহজতর করা: সরকারি বা বেসরকারি দপ্তরে সংবাদ সংগ্রহের জন্য গেলে সাংবাদিকদের নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। একটি ডিজিটাল আইডি কার্ড বা ডাটাবেজ কার্ড থাকলে তথ্য প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ সহজেই সাংবাদিককে সহযোগিতা করতে পারবে।

৩. মফস্বল সাংবাদিকতার উন্নয়ন: জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে অনেক দক্ষ সাংবাদিক অবহেলিত থাকেন। ডাটাবেজ তাদের একটি জাতীয় স্বীকৃতি দেবে, যা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপ থেকে তাদের সুরক্ষা দেবে।

​বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

​একটি কার্যকর ডাটাবেজ তৈরির জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

  • যৌথ উদ্যোগ: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, প্রেস কাউন্সিল এবং ইউনিয়নগুলোর সমন্বয়ে এই ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।
  • নিয়মিত আপডেট: এটি কেবল একবার তৈরি করলেই হবে না, প্রতি বছর বা দুই বছর অন্তর তথ্য হালনাগাদ করতে হবে।
  • ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: একটি অনলাইন পোর্টাল থাকবে যেখানে সাধারণ মানুষ যেকোনো সাংবাদিকের আইডি নম্বর দিয়ে তার সত্যতা যাচাই করতে পারবে।


​সাংবাদিকতাকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এই স্তম্ভটি যদি অপসাংবাদিকতার ঘুণপোকায় আক্রান্ত হয়, তবে পুরো গণতন্ত্র হুমকিতে পড়বে। প্রকৃত সাংবাদিকদের একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা কোনো নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার নয়, বরং এটি পেশাদারদের সুরক্ষার কবচ। এটি বাস্তবায়িত হলে যেমন সাংবাদিকদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, তেমনি সমাজ পাবে কলুষমুক্ত ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা। সরকারের উচিত অবিলম্বে সকল অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে একটি আধুনিক ও স্বচ্ছ ডাটাবেজ প্রণয়ন করা।


শেখ মো শাহিনুর রহমান উজ্জ্বল 

সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক