মুক্ত গণমাধ্যম ও আগামীর চ্যালেঞ্জ: সংকটে সংকল্পের সেতুবন্ধ- প্রফেসর ড. আসিফ মিজান।

Shahinur Rahman Uzzol
Shahinur Rahman Uzzol Shahinur Rahman Uzzol
প্রকাশিত: ১১:৩৯ পূর্বাহ্ন, ০৩ মে ২০২৬ | আপডেট: ৩:৩৭ অপরাহ্ন, ০৩ মে ২০২৬


আজ ৩ মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। একটি কার্যকর গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত এবং আধুনিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হলো স্বাধীন ও নির্ভীক গণমাধ্যম। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে বিশ্বজুড়ে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে জুলুমের শিকার হয়েছেন, আজকের এই দিনে তাঁদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। একইসাথে বিশ্বের সকল সাহসী সাংবাদিক ও তথ্যকর্মীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।


​২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ও প্রাসঙ্গিকতা

চলতি বছর বিশ্বজুড়ে দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য-  "পরিবেশগত সংকটে সাংবাদিকতা: সত্যের সন্ধানে সুরক্ষিত গণমাধ্যম"। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক বিপর্যয়ের এই সন্ধিক্ষণে নির্ভীক সাংবাদিকতার গুরুত্ব আজ অপরিসীম। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরও একটি জরুরি আহ্বান-  "জনআস্থা পুনর্গঠন: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা"। অর্থাৎ, বৈশ্বিক পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ে গণতন্ত্রের সুরক্ষা- উভয় ক্ষেত্রেই সাংবাদিকতাকে ঢাল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।


​প্রত্যাশা ও আগামীর লক্ষ্য

একটি আধুনিক ও সংস্কারমুখী রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের কাছে আমাদের প্রত্যাশা বহুমাত্রিক:


​তথ্যের বিশুদ্ধতা ও নৈতিকতা: গুজব ও অপপ্রচারের ভিড়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং দলীয় লেজুড়বৃত্তি ত্যাগ করে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা।


​আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার: সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো সকল নিবর্তনমূলক আইনের আমূল সংস্কার, যেন সাংবাদিকরা ভয়হীনভাবে ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারেন।


​আর্থিক সুরক্ষা ও স্বচ্ছতা: সংবাদকর্মীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা এবং করপোরেট বা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে মালিকানার স্বচ্ছতা বজায় রাখা।


​প্রযুক্তি ও জনস্বার্থ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সত্য যাচাই এবং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরকে মূলধারায় তুলে আনা।


​বিদ্যমান বাস্তবতা ও সংকটের রূপরেখা

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝে আজও এক বিশাল ফারাক বিদ্যমান। বর্তমানে গণমাধ্যম এক কঠিন বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে:


১. নিরাপত্তা ও ডিজিটাল ঝুঁকি: একদিকে সরাসরি হামলা ও মামলার হার ক্রমবর্ধমান, অন্যদিকে ডিজিটাল নজরদারি ও অ্যালগরিদমের প্রভাব মুক্ত সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।


২. অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা: বিজ্ঞাপন বাজারের সংকোচন এবং 'ছাঁটাই সংস্কৃতি' সাংবাদিকদের সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে সীমিত করে দিচ্ছে।


৩. সেলফ-সেন্সরশিপ: দীর্ঘদিনের ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা অর্জনে এখনও সময় লাগছে। তবে বর্তমানে 'গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন' গঠন একটি ইতিবাচক আশার আলো দেখাচ্ছে।


তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকদের অধিকার নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের 'জানার অধিকার'-এর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। সাংবাদিকতা যখন চাপের মুখে থাকে, তখন গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, বরং গণমাধ্যমকে একটি স্বাধীন ও টেকসই অর্থনৈতিক মডেলে দাঁড় করানো আজ সময়ের দাবি।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের অঙ্গীকার হোক- ভয়ভীতি ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে থেকে সত্য প্রকাশ করা। রাষ্ট্র, সমাজ এবং মালিকপক্ষকে সাংবাদিকতার জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের নতুন যাত্রায় গণমাধ্যম যেন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর হাতিয়ার না হয়ে জনগণের প্রকৃত কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে, এটাই হোক আজকের দিনের মূল লক্ষ্য।


লেখকঃ ভাইস-চ্যান্সেলর, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, মোগাদিসু, সোমালিয়া।