বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেলেন ৭ লেখক
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২৪ পেলেন সাত লেখক। শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এ পুরস্কার তুলে দেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
আগেই জানানো হয়েছিল পুরস্কার প্রাপকদের নাম। সেই তালিকা নিয়ে ওঠে বিতর্কও। পুরস্কার ঘোষণা, স্থগিতের পর নতুন তালিকা প্রকাশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। আলোচিত সেই বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪ নিলেন সাত লেখক।
এর আগে গত ২৩ জানুয়ারি নাট্য গবেষক সৈয়দ জামিল আহমেদ, প্রাবন্ধিক সলিমুল্লাহ খানসহ ১০ জনকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। পরে তালিকায় থাকা কারও কারও সম্পর্কে ‘কিছু অভিযোগ’ আসায় ২৫ জানুয়ারি পুরস্কার স্থগিত করা হয়।
এরপর ২৯ জানুয়ারি তিনজনকে বাদ দিয়ে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কথাসাহিত্যে সেলিম মোরশেদ, মুক্তিযুদ্ধে মোহাম্মদ হান্নান এবং শিশুসাহিত্যে ফারুক নওয়াজকে বাদ দিয়ে পুরস্কারের জন্য ৭ জনকে মনোনীত করে বাংলা একাডেমির নির্বাহী পরিষদ। তবে স্থগিত হওয়ার পর কথাসাহিত্যে সেলিম মোরশেদ তা প্রত্যাখ্যান করার কথা বলেছিলেন।
ফলে এবার সাতজনের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন- কবিতায় মাসুদ খান, নাটক ও নাট্যসাহিত্যে শুভাশিস সিনহা, প্রবন্ধ/গদ্যে সলিমুল্লাহ খান, অনুবাদে জি এইচ হাবীব, গবেষণায় মুহম্মদ শাহজাহান মিয়া, বিজ্ঞানে রেজাউর রহমান, ফোকলোরে সৈয়দ জামিল আহমেদকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়।
হাম উপসর্গ নিয়ে একদিনে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু
সব এমপির নির্বাচনি এলাকায় সমান উন্নয়ন হবে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী
যেমনে পারি ডাক্তার দেব--ডেঙ্গু রোগী বেশি হলে--স্বাস্থ্যমন্ত্রী
আমার একটাই কথা, একটাকে সবাই মিলে মোকাবিলা করতেছি। অনেকটা এগোচ্ছি আরেকটা আসতেছে। আপনারা দয়া করে যার যার অবস্থান থেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকবেন। ডেঙ্গুর প্রটোকল মেনটেইন করবেন।’
আজ বুধবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর ৪৫ তম শাহাদত বার্ষিকী উপলক্ষে’ এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এ কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমার একটাই কথা, একটাকে সবাই মিলে মোকাবিলা করতেছি। অনেকটা এগোচ্ছি আরেকটা আসতেছে। আপনারা দয়া করে যার যার অবস্থান থেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকবেন। ডেঙ্গুর প্রটোকল মেনটেইন করবেন।’
চিকিৎসকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের অনেক বিরাট বড় সার্কেল সারা বাংলাদেশে। সবাইকে বলবেন, ওই যে বড় বড় ডাক্তাররা যেগুলো বলেছে, অ্যান্টিবায়োটিক না দেওয়া বা আপনার প্লাজমা লিক শুরু হলে প্রত্যেকটা রোগীর প্রতি খেয়াল রাখা। প্লাজমা লিকে সঙ্গে সঙ্গে ফ্লুইড দেওয়া যাতে করে শকে না চলে যায়। এই জিনিসগুলো আপনারা আপনাদের বন্ধুবান্ধবদের বলবেন। যদি সমস্যা হয়, রোগী বেশি হয়ে যায়, আমাদের জানাবেন। আমরা যেমনে পারি ডাক্তার দেব। প্রয়োজনে আপনাদের বাইটা (ভাগ করে) দিয়ে দিব। তবু আমাদের মানুষদের বাঁচাতে হবে।’
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক অবদানের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘সিপাহি বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং রাজনীতির পথ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন।’ এ সময় জিয়াউর রহমান এবং তাঁর সন্তান আরাফাত রহমান কোকোর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তারেক রহমানের সুস্বাস্থ্য ও দেশের জন্য তাঁর নেতৃত্বের সফলতা কামনা করেন মন্ত্রী।
প্রাথমিকের পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে সংগীত, নৃত্য, নাট্য ও চারুকলা বই
প্রাথমিক শিক্ষায় শিল্প ও সংস্কৃতিভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ২০২৮ সালের নতুন কারিকুলামে সংগীত, নৃত্যকলা, নাট্যকলা ও চারুকলাকে পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এর আগে ২০২৭ সালে চতুর্থ শ্রেণির শিল্প ও সংস্কৃতি পাঠ্যবইয়ে চারটি পৃথক অধ্যায়ে এসব বিষয় যুক্ত করা হবে।
বুধবার (১০ জুন) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত, নৃত্যকলা, নাট্যকলা ও চারুকলা বিভাগের শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।
প্রাথমিক শিক্ষায় সংগীত, নৃত্যকলা ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার বিস্তার, নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন এবং দক্ষ শিক্ষক তৈরির লক্ষ্যে এ সভার আয়োজন করা হয়। সভায় ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় সংগীত, নৃত্যকলা ও ক্রীড়াভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারিত হলে ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক বিশেষায়িত শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের প্রয়োজন হবে। এর ফলে সংগীত, নৃত্যকলা, চারুকলা, নাট্যকলা ও ক্রীড়া বিষয়ে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং এসব বিষয়ে একটি টেকসই পেশাগত পথ গড়ে উঠবে।
তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে এ খাতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহযোগিতা কামনা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তারা চান সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। এ লক্ষ্যে কীভাবে তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে শিক্ষকতা-সংক্রান্ত প্রস্তুতি যুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করতে চায় সরকার।
ববি হাজ্জাজ বলেন, সংগীত, নাট্যকলা ও নৃত্যকলাকে শুধু সহশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে নয়, শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার। এজন্য কারিকুলাম উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষক তৈরির পরিকল্পনাও এখন থেকেই নেওয়া হচ্ছে।
সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব, দেশের ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যান এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ এখন স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য নাম: সেনাপ্রধান
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ এখন একটি স্বীকৃত ও অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য নাম বলে মন্তব্য করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বুধবার (১০ এপ্রিল) ঢাকার সেনাকুঞ্জে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
সেনাপ্রধান বলেন, ১৯৮৮ সাল থেকে জাতিসংঘের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বশান্তিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে এবং বর্তমানে বিশ্বের ৯টি মিশনে ৪ হাজার ২১২ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিয়োজিত রয়েছেন।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৯টি শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩ হাজার ৬০৮ জন, নৌবাহিনীর ৩০২ জন, বিমান বাহিনীর ২৬৭ জন এবং পুলিশের ৩৫ জন সদস্যসহ মোট ৪ হাজার ২১২ জন শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করছেন।
সেনাপ্রধান বলেন, ‘পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি নারী শান্তিরক্ষীরাও অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের ৩ হাজার ৯০৫ জন নারী শান্তিরক্ষী সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ২৯৪ জন নারী শান্তিরক্ষী নিয়োজিত রয়েছেন।’
বর্তমান বিশ্বে শান্তিরক্ষা মিশনের ধরন ও চ্যালেঞ্জ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা উন্নত প্রশিক্ষণ, নৈতিক মূল্যবোধ, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার মাধ্যমে সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। জাতিসংঘের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, চিকিৎসা ও প্রকৌশল সহায়তা এবং নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে কাজ করছে বাংলাদেশ।’
তিনি আরও জানান, জাতিসংঘের নতুন উদ্যোগ হিসেবে হাইতিতে গঠিত ‘গ্যাং সাপ্রেশন ফোর্সে’ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও পুলিশের সদস্যরা অংশ নেবেন। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার আরও জোরালো হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিদেশি অতিথিদের উদ্দেশে সেনাপ্রধান বলেন, ‘জাতিসংঘের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ তার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি অব্যাহত রাখবে। একইসঙ্গে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ কাজ করে যাবে।’
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের দক্ষতা, সাহস, শৃঙ্খলা, মানবিক মূল্যবোধ ও পেশাদারিত্ব বিশ্বে দেশের মর্যাদা আরও উজ্জ্বল করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন সেনাপ্রধান।
তিনি প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সার্বিক সহযোগিতার কারণেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।’
অনুষ্ঠান সফলভাবে আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান সেনাপ্রধান। পাশাপাশি অনুষ্ঠানে উপস্থিত দেশি-বিদেশি অতিথিদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
খালাস পেলেন নাসির-তামিমা, মামলা খারিজ
আইনগতভাবে বিচ্ছেদের আগেই নতুন করে বিয়ে করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তার স্ত্রী তামিমা সুলতানা তাম্মিকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (১০ জুন) ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম জশিতা ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন। ব্যভিচারের অভিযোগ এনে তামিমার সাবেক স্বামী রাকিব হোসেন ২০২১ সালে এ মামলা করেছিলেন। এরপর থেকে চার বছরের বেশি সময় ধরে চলছিলো আলোচিত এই মামলা।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১১ সালে রাকিবের সঙ্গে তামিমার বিয়ে হয়। তাদের একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। কিন্তু বৈবাহিক সম্পর্ক চলমান থাকা অবস্থায় ২০২০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তামিমা ক্রিকেটার নাসির হোসেনকে বিয়ে করেন।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাসির ও তামিমার বিয়ের ছবি প্রকাশ্যে এলে বিষয়টি জানতে পারেন রাকিব। পরে তিনি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে একই বছরের সেপ্টেম্বরে নাসির, তামিমা ও তামিমার মা সুমি আক্তারকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ।
২০২২ সালে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে নাসির ও তামিমার বিচার শুরু হয়। তবে তামিমার মা সুমি আক্তারকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে অভিযোগ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ এবং অব্যাহতির বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ পৃথক আবেদন করলেও ২০২৩ সালে আদালত উভয় আবেদনই খারিজ করে দেন। এর মধ্য দিয়ে মামলার বিচার কার্যক্রমের আইনি বাধা দূর হয়।
মামলায় মোট ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। চলতি বছরের মার্চে আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে নাসির ও তামিমা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। পরে আদালতে সাফাই সাক্ষ্য দিয়ে তামিমা বলেন, আগের স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে বৈধভাবেই তিনি নাসির হোসেনকে বিয়ে করেছেন।
নাসিরের বিরুদ্ধে দুটি এবং তামিমার বিরুদ্ধে তিনটি ধারায় অভিযোগ গঠন করে বিচার পরিচালিত হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে নাসিরের সর্বোচ্চ সাত বছর এবং তামিমার সর্বোচ্চ ২১ বছরের কারাদণ্ড হতে পারত। তবে বিচার শেষে আদালত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় দুজনকেই খালাস দেন।
নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যু-আহত হলে ১০ লাখ পর্যন্ত অনুদান দেবে ইসি
নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচনে এবং ভোটার তালিকা প্রণয়ন কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনকালে কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বড় ধরনের শারীরিক ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলে তাদের এবং তাদের পরিবারকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত এককালীন আর্থিক অনুদান দেওয়ার লক্ষ্যে একটি নতুন নীতিমালা জারি করেছে।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
ইসি জানায়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে জারি করা এই নীতিমালার আওতায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে দুর্বৃত্তদের হামলা বা দুর্ঘটনায় কেউ প্রাণ হারালে তার পরিবারকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং আকস্মিক অসুস্থতা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নীতিমালার মাধ্যমে দায়িত্বপালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেকোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা, অঙ্গহানি বা চিকিৎসার ব্যয়বহুল আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে নির্বাচন কমিশন নিজস্ব বাজেট থেকে এই বড় অঙ্কের অনুদান নিশ্চিত করবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনে ও ভোটার তালিকা প্রণয়ন সংক্রান্ত কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনকালে অসুস্থ/গুরুতর অসুস্থ/আহত/গুরুতর আহত কর্মকর্তা/কর্মচারী ও মৃত ব্যক্তির পরিবারকে আর্থিক সহায়তা/অনুদান প্রদান নীতিমালা-২০২৬ শিরোনামের এই নীতিমালাটি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ নির্বাচনে নিয়োজিত সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এই নীতিমালার আওতায় আর্থিক সুবিধার সুবিধাভোগী হবেন।
এই নীতিমালার অধীনে অনুদানের হারকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি দুর্বৃত্তদের হামলা অথবা কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার পরিবারকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে। একই কারণে কেউ গুরুতর আহত বা স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা, গুরুতর আহত বা সাময়িকভাবে অক্ষম হলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা এবং সাধারণ আহতের ক্ষেত্রে আঘাতের ধরন বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হবে।
দ্বিতীয়ত, দায়িত্ব পালনকালে কেউ যদি আকস্মিকভাবে অসুস্থ বা মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার পরিবার সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা অনুদান পাবেন। এছাড়া আকস্মিক গুরুতর অসুস্থতা বা স্থায়ী অক্ষমতার জন্য সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা, সাময়িক অসুস্থতার জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা, হাসপাতালে ভর্তির পর ব্যয়বহুল চিকিৎসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা এবং সাধারণ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, নীতিমালায় অনুদান প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পরিবারের উত্তরাধিকার নির্ধারণের জন্য অর্থ বিভাগের সর্বশেষ সরকারি কর্মচারী পেনশন সহজীকরণ আদেশ অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। যদি মৃত ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী থাকে তবে অনুদানের টাকা তাদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করা হবে এবং এক্ষেত্রে স্ত্রীদের যৌথভাবে আবেদন করতে হবে। তবে অনুদান পাওয়ার আগে স্বামী বা স্ত্রী পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে এই সুবিধা পাবেন না। মৃত ব্যক্তির কোনো স্বামী বা স্ত্রী জীবিত না থাকলে তার অনূর্ধ্ব ২৫ বছর বয়সী ছেলে বা অবিবাহিত মেয়ে এবং সন্তান না থাকলে বাবা-মা এই অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন। নাবালক সন্তান থাকলে অভিভাবক নির্ধারণের ক্ষেত্রে পারিবারিক আদালত অর্ডিন্যান্স ১৯৮৫ প্রযোজ্য হবে। এছাড়া অবিবাহিতদের ক্ষেত্রে বাবা-মা বা ভাই-বোন এবং কোনো সন্তান না থাকলে স্বামী বা স্ত্রী অর্ধেক এবং বাকি অর্ধেক বাবা-মা বা অবিবাহিত ভাই-বোন সমহারে পাবেন। কোনো উপযুক্ত উত্তরাধিকারী না থাকলে বিবাহিত মেয়েরাও প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ আবেদন করতে পারবেন।
এছাড়া আর্থিক সহায়তার জন্য যেকোনো দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার সর্বোচ্চ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত ছকে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার বা অফিস প্রধানের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব বা সচিব বরাবর আবেদনপত্র পাঠাতে হবে। আবেদনের সঙ্গে নির্ধারিত আবেদন ফরম, আবেদনকারীর সত্যায়িত ছবি, উত্তরাধিকার সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এবং সিভিল সার্জন বা সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রদত্ত চিকিৎসাজনিত বা মৃত্যুর সনদ সংযুক্ত করতে হবে।
এই আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়নের জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন ব্যবস্থাপনা-১ উইংয়ের যুগ্মসচিবকে সভাপতি এবং বাজেট ও অর্থ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিবকে সদস্য সচিব করে ৫ সদস্যের একটি যাচাই-বাছাই ও সুপারিশ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি প্রতি অর্থবছরে অন্তত দুইবার প্রাপ্ত আবেদনসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে অনুদানের পরিমাণ নির্ধারণপূর্বক সচিবের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবে। পরে এই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবে এককালীন এই অনুদানের অর্থ সরাসরি দেওয়া হবে। প্রতি অর্থবছরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নিজস্ব বাজেট থেকে এই কল্যাণমূলক অনুদানের অর্থ সংস্থান করা হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ১৭৫ বাংলাদেশি শহীদ হয়েছেন : প্রধানমন্ত্রী
বুধবার সকালে (১০ জুন) আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষ্যে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত অবস্থায় ২০২৫ সালে সুদানে শাহাদাতবরণকারী ছয় সেনাসদস্যের স্ত্রীর হাতে বিশেষ সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। ওই হামলাসহ সম্প্রতি চলমান মিশনগুলোতে আহত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের হাতেও সম্মাননা তুলে দেন তিনি।
এছাড়া বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া সদস্যদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি কুশল বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষাবাহিনীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ১৯৮৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৭৫ জন শান্তিরক্ষী শহীদ হয়েছেন। অনেকে আহত হয়েছেন। আমি আল্লাহর দরবারে তাদের মাগফিরাত কামনা করছি। হতাহতদের শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই গভীর সহানুভূতি এবং সমবেদনা।
তিনি বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ বছর যারা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, আজকের এই বিশেষ দিনে তাদের পরিবারকে সম্মাননা জানিয়ে আমি আমার বিশ্বাস থেকে একটি কথা বলতে চাই, শুধু বাংলাদেশের জন্য নয় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষাবাহিনীর সদস্য হিসেবে শহীদদের এই আত্মদান, যুদ্ধবিরোধী শান্তিকামী মানুষের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, শুধু মাতৃভূমির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বই নয় জাতিসংঘের পতাকাতলে শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে যেকোনো মূল্যে শান্তি রক্ষায় বদ্ধ পরিকর।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমি যতদূর জানতে পেরেছি, এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশের ২ লাখেরও বেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বের ৪৩টি দেশের প্রায় ৬৩টি শান্তিরক্ষা মিশনে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানেও প্রায় ৫ হাজার ৮৬০ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ১০টি শান্তিরক্ষা মিশনে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। হাইতিতে নতুন একটি মিশনে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষাবাহিনীতে পুরুষের পাশাপাশি বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশের প্রায় ১১ শতাংশ নারী সদস্য সাহসের সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। আমি বিশ্বাস করি, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষাবাহিনীতে নারী সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অবশ্যই এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আগামী দিনগুলোতেও নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ অব্যাহত থাকবে বলে আশা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা মিশনে, আপনাদের নিষ্ঠা, কর্তব্যবোধ এবং সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের কারণেই বিশ্বমঞ্চে অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সুনাম ও অবস্থান সুদৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় এটি আপনাদের সাহস এবং গভীর দায়িত্ববোধের প্রতিফলন বলেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। বিশ্ব শান্তি রক্ষায় আমাদের এই গৌরবের ইতিহাস একদিনে রচিত হয়নি। প্রায় চার দশক ধরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনী একটি আস্থা ও নির্ভরতার নাম।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষাবাহিনীর সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর ভূমিকা সুখ্যাতি পেয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি আরও বলেন, তবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে, দেশে সশস্ত্রবাহিনীর কিংবা সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে কিছু অপ তৎপরতা কখনো কখনো জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির কারণ হয়েছে। দেশে বিদেশে সশস্ত্রবাহিনীর ইমেজ বিনষ্ট করতে নানারকম তৎপরতাও বিদ্যমান ছিল। সমস্ত ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে ৭৫ এর সাত নভেম্বর স্বাধীনতার ঘোষকের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ঐক্যবদ্ধভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।
তারেক রহমান বলেন, এরপরও বিভিন্ন সময়ে নানারকম ঘটনায় সশস্ত্রবাহিনীর ঐক্য বিনষ্টের তৎপরতা চললেও ২০০৯ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে সশস্ত্রবাহিনীর উপর সর্বগ্রাসী আঘাতটি এসেছিল। সেই আঘাতটির ফলে বাংলাদেশে কি ঘটেছিল সেটি আমাদের সবার জানা। সুতরাং, ইউনিফর্মধারী বাহিনীর জন্য প্রধান বার্তাটি হলো, ‘প্রফেশনালিজম, ইউনিটি, ডিসিপ্লিন এবং চেইন অব কমান্ড’ ছাড়া সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকা কঠিন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধুই অতীত চর্চা নয় বরং অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিটি রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সামনে স্বমহিমায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যারা সশস্ত্রবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করছেন অথবা সরকারে কিংবা জনপ্রশাসনে রয়েছেন, আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। এই দেশটা আমাদের সবার। আমরা দেশে কিংবা বিদেশে যেখানে যেই দায়িত্ব পালন করছি সেই দায়িত্বটি যথাযথভাবে পালন করাই হোক আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার।
বর্তমান বিশ্ব এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তনের ফলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের চ্যালেঞ্জগুলো এখন অনেক বেশি বহুমুখী ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথাগত যুদ্ধের পাশাপাশি এখন সাইবার যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার, মিডিয়া অপপ্রচার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট, নিরাপত্তা সংকট বিশ্বশান্তির নতুন অন্তরায়। তাই আমাদের ভবিষ্যৎ মিশনগুলো হতে হবে আরও আধুনিক, দূরদর্শী এবং প্রযুক্তিনির্ভর । এমন পরিস্থিতিতে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন কিংবা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দায়িত্ব পালনের জন্য সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীর মর্ডানাইজেশনের লক্ষ্যে সরকার পর্যায়ক্রমিকভাবে উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বৃটিশ হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত
আজ ১০ জুন (বুধবার) সকাল ১১:৩০ টায় জাতীয় সংসদ ভবনে বিরোধীদলীয় নেতার কার্যালয়ে মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি’র সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত মান্যবর ব্রিটিশ হাইকমিশনার মিস সারাহ কুক এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। এ সময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ হাইকমিশনের হেড অব পলিটিক্যাল মি. টিমোথি ডাকেট এবং সেকেন্ড সেক্রেটারি (পলিটিক্যাল) মিস কেট ওয়ার্ড।
সৌজন্য সাক্ষাৎটি অত্যন্ত আন্তরিক, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আসন্ন জাতীয় বাজেট, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা, বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের বিভিন্ন দিকসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে মতবিনিময় করা হয়।
বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করা, বাংলাদেশের উন্নয়নে যুক্তরাজ্যের ভূমিকার প্রশংসা, জামায়াতের ছায়া সরকার ও ছায়া বাজেটের প্রশংসা এবং অভিবাসন প্রক্রিয়া নিয়েও বৈঠকে আলোচনা করা হয়।
উভয় দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ পারস্পরিক সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও গতিশীল হবে বলে উভয় পক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে আমীরে জামায়াতের সঙ্গে মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান, এমপি এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা টিমের সদস্য জনাব আলী আহমাদ মাবরুর উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: প্রতিবেশীর সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চ্যালেঞ্জ---প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
৪,১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত কেবল একটি ভৌগোলিক রেখামাত্র নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্নায়ুকেন্দ্র। সাম্প্রতিক সময়ে 'পুশইন' ও 'পুশব্যাক'-এর মতো একতরফা ও অনিয়মিত চর্চা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার জায়গাকে সংকীর্ণ করে তুলছে। আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিক বিবর্তনের আলোকে এই সংকটের গভীর বিশ্লেষণ এবং একটি টেকসই ও মানবিক রূপরেখা এখন সময়ের দাবি।
সম্পর্কের গভীরতা ও সীমান্তের রূঢ় বাস্তবতাঃ
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ইতিহাসে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক একটি অনন্য ও বহুমাত্রিক অধ্যায়। এই দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত কেবল দুটি দেশের মানচিত্রকেই পৃথক করেনি, বরং দুই ভূখণ্ডের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মনস্তত্ত্বকে এক সুতোয় বেঁধেছে। ঐতিহাসিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ককে প্রায়শই গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে এই সম্পর্কের অজস্র ইতিবাচক অর্জন থাকা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা- বিশেষ করে ‘পুশব্যাক’ (Pushback) এবং ‘পুশইন’ (Push-in)-এর ঘটনাপ্রবাহ- উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত দ্বন্দ্ব ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের জন্ম দিয়েছে। সমসাময়িক রাজনীতিতে এই দুটি প্রক্রিয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিতর্কিত রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তথাকথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ ঠেকানোর রাষ্ট্রীয় বয়ান, অন্যদিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার জাতীয় তাগিদ- এই দুইয়ের টানাপোড়েনে সীমান্তরেখা এখন এক অদৃশ্য অথচ অস্থির মনস্তাত্ত্বিক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
পুশইন ও পুশব্যাকের তাত্ত্বিক ও আইনি ব্যবচ্ছেদঃ
আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অভিবাসন আইনের ক্ষেত্রে ‘পুশব্যাক’ এবং ‘পুশইন’ শব্দ দুটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত ও প্রায়োগিক অর্থ বহন করে, যা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
পুশব্যাক (Pushback): কোনো একটি রাষ্ট্র কর্তৃক তার সীমান্ত অতিক্রম করে আসা অনুপ্রবেশকারী, আশ্রয়প্রার্থী বা অভিবাসীদের কোনো ধরনের আইনি যাচাই-বাছাই, জুডিশিয়াল রিভিউ (আদালতি পর্যালোচনা) বা আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশে ফেরত পাঠানো।
পুশইন (Push-in): এটি আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও একতরফা কৌশল। যখন কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে বসবাসকারী কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা বা দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল ছাড়াই, রাতের অন্ধকারে বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেয়, তখন তাকে ‘পুশইন’ বলা হয়।
আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের বৈশ্বিক মানদণ্ডে এই দুই প্রক্রিয়াই সম্পূর্ণ অবৈধ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো 'নন-রিফোলমেন্ট' (Non-refoulement) নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো দেশে বা পরিস্থিতিতে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা মানবাধিকার চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন (OHCHR) এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে, এই একতরফা চর্চা সরাসরি ''আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি' (ICCPR)'-এর চরম লঙ্ঘন, যা নো-ম্যানস ল্যান্ডে রাষ্ট্রহীনতার এক চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি করে।
সার্বভৌম ক্ষমতা ও আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির তাত্ত্বিক রূপরেখাঃ
সীমান্তের এই সংকটকে কেবল দুটি দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামোতে বিশ্লেষণ করলে এর তিনটি রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
> আঞ্চলিক হেজিমনি বা আধিপত্যবাদ
> বলপ্রয়োগের একতরফা রাজনীতি
> 'স্টেট অব এক্সেপশন' ও 'বেয়ার লাইফ'-এর অবতারণা
গ্রামসীয় হেজিমনি ও বলপ্রয়োগঃ
ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর 'হেজিমনি' (Hegemony) বা আধিপত্যবাদের তত্ত্বে দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কাঠামোগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিজের এজেন্ডা বজায় রাখে। ভারত যখন দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা কোনো আন্তর্জাতিক আইনি প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে একতরফাভাবে পুশব্যাক বা পুশইনের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন তা গ্রামসীয় তত্ত্বের 'বলপ্রয়োগের রাজনীতি'র রূপ পরিগ্রহ করে।
ফুকোর বায়োপলিটিক্স ও আগামবেনের স্টেট অব এক্সেপশনঃ
ফরাসি দার্শনিক 'মিশেল ফুকো'র 'বায়োপলিটিক্স' (Biopolitics) তত্ত্ব অনুযায়ী, আধুনিক রাষ্ট্র মানুষের জীবন, শরীর এবং জনসংখ্যাকে ক্ষমতার বলয়ে নিয়ন্ত্রণ করে। সীমান্তে পুশইন বা পুশব্যাকের শিকার মানুষদের রাষ্ট্র নিজের ক্ষমতার স্বার্থে 'অপছন্দনীয় জনসংখ্যা' হিসেবে চিহ্নিত করে। ইতালীয় দার্শনিক 'জর্জিও আগামবেন' এই ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্র যখন স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়াকে স্থগিত করে নিজের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তখন তাকে 'স্টেট অব এক্সেপশন' (State of Exception) বলা হয়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ড বা কাঁটাতারের মধ্যবর্তী অঞ্চলটি এমন এক আইনি শূন্যতার ক্ষেত্রে পরিণত হয়, যেখানে পুশব্যাকের শিকার মানুষগুলো পরিণত হয় 'বেয়ার লাইফ' (Bare Life) বা স্রেফ অধিকারহীন জীবে।
সংকটের ঐতিহাসিক বিবর্তনঃ
বর্তমান সীমান্ত সংকটের শিকড় প্রোথিত রয়েছে এই অঞ্চলের দীর্ঘ ও জটিল রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীরে। একে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা যায়ঃ
| ঐতিহাসিক পর্যায় | মূল ঘটনা ও প্রভাব | দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবস্থা |
১৯৪৭-এর দেশভাগ ও ১৯৭১: র্যাডক্লিফ লাইনের অবাস্তব সীমানা নির্ধারণ কোটি কোটি মানুষের জীবনকে দুই ভাগে বিভক্ত করে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এক কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী হয়, যার একটি বড় অংশের পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ সীমান্তের ওপারে থেকে যায়।
ঐতিহাসিক নির্ভরশীলতা: জীবন ও সংস্কৃতির গভীর যোগাযোগ, তবে সীমানা নিয়ে এক ধরনের অন্তর্নিহিত অনিশ্চয়তা।
১৯৭৪-এর চুক্তি ও পরবর্তী শূন্যতা: ঐতিহাসিক 'ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তি'র দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১৫ সালে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়। এই দীর্ঘ অন্তর্বর্তী সময়ে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করে এবং সীমান্ত সুরক্ষাকে সম্পূর্ণ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শুরু করে।
প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব: দ্বিপাক্ষিক চুক্তির দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও সীমান্ত সুরক্ষাকে একপাক্ষিক ও সামরিকায়িত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। |
২০০৩-বর্তমান (পুশব্যাক ও সংকট): ২০০৩ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন এনডিএ সরকারের আমলে সাতক্ষীরা ও যশোর সীমান্তে কয়েকশ বাংলাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক পুশব্যাক করার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা তৎকালীন বিডিআর ও বিএসএফ-এর মধ্যে তীব্র সংঘাতের জন্ম দেয়। বর্তমানে এনআরসি (NRC) ও সিএএ (CAA) এর কারণে এই সংকট তীব্রতর হয়েছে।
কাঠামোগত দ্বন্দ্ব: একতরফা বলপ্রয়োগ, মানবাধিকার সংকট ও দ্বিপাক্ষিক ডিপ্লোম্যাটিক অনাস্থার ক্রমান্বয় বৃদ্ধি।
সংকটের বহুমুখী চালিকাশক্তিঃ
এই সীমান্ত সংকটের পেছনে মূলত তিনটি চালিকাশক্তি কাজ করছে:
১. ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আইনি রূপান্তর: বিশেষ করে আসাম রাজ্যে বাস্তবায়িত 'জাতীয় নাগরিক পঞ্জি' (NRC) এবং পরবর্তীতে দেশজুড়ে প্রণীত 'নাগরিকত্ব সংশোধন আইন' (CAA) এই সংকটকে তীব্রতর করেছে। ভোটার তালিকা এবং জনমিতিক ভারসাম্যকে কেন্দ্র করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই অনুপ্রবেশের অভিযোগকে একটি সংবেদনশীল নির্বাচনি ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
২. সীমান্ত প্রশাসনের কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্য: ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) এই সীমান্তকে একটি 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ' অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং মানব পাচার রোধে প্রায়শই একতরফা ও আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করে। অন্যদিকে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB) এর অবস্থান হলো—কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব যথাযথ আইনি উপায়ে ও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
৩. তৃণমূল পর্যায়ের সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা: বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দুই পাশেই বিপুলসংখ্যক দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের বসবাস। ভৌগোলিক সান্নিধ্য এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বাভাবিক যাতায়াত ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ভারত যখন এই জটিল সামাজিক-অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কটিকে স্রেফ একটি 'জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি' হিসেবে দেখে এবং ঢালাওভাবে পুশব্যাকের নীতি প্রয়োগ করে, তখন তা সাধারণ মানুষের জীবনকে চরমuncertainty বা অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।
ভারতীয় কূটনীতির দ্বিমুখী আচরণ: ফরমাল বনাম ইনফরমাল প্র্যাকটিসঃ
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় সংকট হলো তার প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক (Formal) প্রতিশ্রুতির সাথে মাঠপর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল (Informal) আচরণের বৈপরীত্য।
কূটনৈতিক অসঙ্গতি: দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে ভারত এবং বাংলাদেশ যখন যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করে, তখন "পারস্পরিক সহযোগিতা", "সীমান্তে শূন্য মৃত্যু" কিংবা "শান্তিপূর্ণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা"র মতো গালভরা আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক বাস্তবতায় দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। কোনো পূর্ব ঘোষণা, আইনি নোটিশ বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রটোকল ছাড়াই রাতের অন্ধকারে বিএসএফের মাধ্যমে পুশইন বা পুশব্যাকের মতো একতরফা পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
ভারতের এই অনানুষ্ঠানিক আচরণ তার প্রতিবেশীদের সাথে 'প্যারেন্টাল' বা অভিভাবকসুলভ এবং ক্ষেত্রবিশেষে বলদর্পী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এই দ্বিমুখী আচরণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে এবং প্রমাণ করে যে, কৌশলগত অংশীদারিত্বের নানামুখী অর্থনৈতিক ও সামরিক চুক্তি সত্ত্বেও, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল জায়গায় ভারত এখনও হেজিমনিক বা একতরফা নীতিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর প্রভাবঃ
এই একতরফা বলপ্রয়োগের নীতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলে এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের কাঠামোগত অনাস্থা তৈরি করে, যা সার্বভৌম সমতার আন্তর্জাতিক নীতিকে সংকুচিত করে ফেলে। এর প্রভাব মূলত দুটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান:
আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তন: বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক (Factor)। ভারতের একতরফা পুশইন ও পুশব্যাকের নীতি যখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে সংকটের মুখে ফেলে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার তাগিদ তৈরি হয়। এই অঞ্চলের অপর বৃহৎ শক্তি চীন যখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে একটি বড় অংশীদার, তখন সীমান্তে ভারতের এই অনমনীয় মনোভাব ঢাকাকে বেইজিংয়ের কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়তে উৎসাহিত করতে পারে।
জনমানসে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বঃ
সীমান্তে পুশইনের শিকার নারী, শিশু এবং অসহায় মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র যখন গণমাধ্যমে উঠে আসে, তখন তা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এর সাথে যুক্ত হয় দীর্ঘদিনের সীমান্ত হত্যার বেদনাদায়ক ইতিহাস। এই মানবিক বিপর্যয়গুলো বাংলাদেশের জনমানসে একটি স্থায়ী 'ভারত-বিরোধী' বয়ান বা ন্যারেটিভকে শক্তিশালী করে, যা দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের বাণিজ্য, ট্রানজিট, এবং তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক যৌথ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে জটিল ও বাধাগ্রস্ত করে তোলে।
সংকট উত্তরণে বহুমাত্রিক সুপারিশমালাঃ
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইন ও পুশব্যাকের মতো জটিল ও সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একতরফা আধিপত্যবাদী মানসিকতা পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই এবং মানবিক কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। এই সংকট উত্তরণের কৌশলগত রোডম্যাপ হতে পারে নিম্নরূপ:
[সার্বভৌম সমতা] ➔ [স্বচ্ছ প্রত্যর্পণ চুক্তি] ➔ [যৌথ সীমান্ত টহল] ➔ [মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি]
১. সার্বভৌম সমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা:
ভারতকে 'আঞ্চলিক হেজিমন' বা একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার নীতি থেকে সরে এসে সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সাথে কাজ করতে হবে। বিএসএফ এবং বিজিবি-এর মধ্যে মাঠপর্যায়ে কেবল আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠক নয়, বরং রিয়াল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ টহলের মাধ্যমে সীমান্তকে একটি 'শান্তি অঞ্চল' হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
২. দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি (Legal Deportation Treaty) যথাযথ অনুসরণ:
যদি কোনো দেশে আসলেই কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল অনুযায়ী তার নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। রাতের অন্ধকারে জোরপূর্বক পুশইন করার পরিবর্তে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে স্বচ্ছ এবং আইনি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
৩. আন্তর্জাতিক মানবিক মানদণ্ডের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ:
উভয় রাষ্ট্রকেই জাতিসংঘের 'নো-ম্যানস ল্যান্ড' নীতি এবং মানবাধিকারের বৈশ্বিক সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। নো-ম্যানস ল্যান্ডে মানুষকে আটকে রেখে রাষ্ট্রহীন বা অধিকারহীন জীবে পরিণত করার নিষ্ঠুর চর্চা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সীমান্ত সুরক্ষাকে স্রেফ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে এর একটি মানবিক রূপ দেওয়া অপরিহার্য।
৪. উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংলাপ:
সীমান্ত হত্যা এবং পুশব্যাকের মতো ঘটনাগুলো দুই দেশের সামগ্রিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে স্থবির করে দেয়। তাই নিয়মিত বিরতিতে যৌথ পরামর্শক কমিশন (JCC) এবং শীর্ষ রাজনৈতিক পর্যায়ে এই নির্দিষ্ট এজেন্ডাটি নিয়ে খোলামেলা ও গঠনমূলক সংলাপের আয়োজন করতে হবে, যা দুই দেশের মধ্যকার অনাস্থার সংকট দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌম সমতার ভবিষ্যৎঃ
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের পুশইন ও পুশব্যাকের ভূ-রাজনীতি কেবল একটি ভূখণ্ডগত বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আইনি দ্বন্দ্ব নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার অসমতা এবং রাষ্ট্রীয় আধিপত্যবাদের এক বাস্তব প্রতিফলন। একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ অঞ্চলের স্বার্থে দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার সম্পর্ক একতরফা বলপ্রয়োগের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকতে পারে না।
ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক বন্ধনে আবদ্ধ এই দুই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌম সমতার নীতির ওপর নির্ভরশীল। সীমান্তে মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং পুশইন ও পুশব্যাকের মতো সংকটগুলোর কূটনৈতিক ও আইনি সমাধানের মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রকৃত 'সুবর্ণ অধ্যায়' নিশ্চিত করা সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
সর্বশেষ - বাংলাদেশ
- ১ হাম উপসর্গ নিয়ে একদিনে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু
- ২ সব এমপির নির্বাচনি এলাকায় সমান উন্নয়ন হবে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী
- ৩ যেমনে পারি ডাক্তার দেব--ডেঙ্গু রোগী বেশি হলে--স্বাস্থ্যমন্ত্রী
- ৪ প্রাথমিকের পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে সংগীত, নৃত্য, নাট্য ও চারুকলা বই
- ৫ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ এখন স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য নাম: সেনাপ্রধান