কালুরঘাটে ১১,৫৬০ কোটি টাকার রেল-কাম-সড়ক সেতু নির্মাণ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন

newsdesk | প্রকাশিত: ১১:০৮ অপরাহ্ন, ০৭ অক্টোবর ২০২৪

 চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে নির্বিঘ্ন নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) আজ কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর উপর বিদ্যমান পুরাতন সেতুর পাশে ১১,৫৬০.৭৭ কোটি টাকার নতুন রেল-কাম-সড়ক সেতু প্রকল্প অনুমোদন করেছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে রাজধানীতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত চলতি অর্থবছরের (অর্থবছর ২৫) তৃতীয় ও অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিতীয় একনেক বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানান, দিনের বৈঠকে মোট আনুমানিক ২৪ হাজার ৪১২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয়ে মোট চারটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মোট প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অংশ থেকে ৭,৭৪৬.৬৬ কোটি টাকা, প্রকল্প সহায়তা থেকে ১৬,০১২.৩৩ কোটি টাকা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ৬৫৩.৯৫ কোটি টাকা আসবে।
অনুমোদিত চারটি প্রকল্পের মধ্যে দু’টি নতুন ও দু’টি সংশোধিত প্রকল্প। এছাড়া বৈঠকে ব্যয় না বাড়িয়ে সাতটি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়।
রেলপথ মন্ত্রণালয় ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রেল-কাম-সড়ক সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে ।
মোট ১১,৫৬০.৭৭ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ৪,৪৩৫.৬২ কোটি টাকা আসবে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে এবং বাকি ৭,১২৫.১৫ কোটি টাকা আসবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল (ইডিসিএফ) এবং ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট প্রমোশন ফ্যাসিলিটিজ (ইডিপিএফ), কোরিয়া থেকে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা জানান, কালুরঘাটে বিদ্যমান সেতুটি পুরনো ও জরাজীর্ণ হওয়ায় এ ব্যাপারে নতুন প্রকল্পের কথা বিবেচনা করা হয়েছে।তিনি বলেন, সরকার কক্সবাজারকে আরও উন্নত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর করতে চায়। এছাড়াও মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সংলগ্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্যও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন। এ জন্য সরকার মনে করেছে, এ ক্ষেত্রে একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত।
পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে নির্বিঘ্ন ও নিরবচ্ছিন্ন রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করা এবং ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে সংযোগের সুযোগ তৈরি করা। রেলপথ মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে পুরানো ও জরাজীর্ণ কালুরঘাট সেতু দিয়ে ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে ট্রেন চলাচল করতে পারে না। এছাড়া মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর চালু হলে, এ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন চাঙ্গা হবে, তেমনি এ রুটের গুরুত্বও বাড়বে। ইতোমধ্যেই দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন চালুর মাধ্যমে ঢাকা ও কক্সবাজারের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। ফলে পর্যটন নগরীর সঙ্গে নির্বিঘ্নে যোগাযোগ নিশ্চিত করতে বিদ্যমান পুরাতন সেতুর পাশে কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর ওপর নতুন রেল-কাম-সড়ক সেতু নির্মাণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছে এবং এইভাবে কোরিয়ান সরকারের অর্থায়নে অনুমোদিত হয়েছে।
বর্তমানে দেশের আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমের ৭০ শতাংশ হয়ে থাকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে নির্বিঘœ  রেল যোগাযোগ এবং পণ্য পরিবহন নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। নতুন সেতুটি নির্মিত হলে, এই অঞ্চলের বিভিন্ন রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত কল-কারখানার পাশাপাশি শিল্প প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য পরিবহন করতে সক্ষম হবে। মূল প্রকল্পের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ৭০০ মিটার রেল-কাম-রোড ব্রিজ নির্মাণ, ৬.২০ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট নির্মাণ, ২.৪০ কিলোমিটার সড়ক ভায়াডাক্ট, ৪.৫৪ কিলোমিটার বাঁধ, ১১.৪৪ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ এবং আনুষঙ্গিক কাজ।
অতিরিক্ত ৬,৫৭৩.৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় সংশোধিত মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়নের অনুমোদন প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, এটি একটি বড় প্রকল্প। প্রকল্পটির ভূ-রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। তিনি বলেন, এই বন্দরের অর্থায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চীন ও ভারতের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, মাতারবাড়ী বন্দরে প্রয়োজনীয় কাজ এখনো শুরু হয়নি এবং বন্দরের উন্নয়নে রাস্তা নির্মাণ করা হবে।
সভায় অনুমোদিত অন্য দুটি প্রকল্প হল- সাজেক রোড কানেক্টিভিটি, প্রকল্প-২: এলেঙ্গা-হাটিকামরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, ৩৭৬.৯৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ে দ্বিতীয় সংশোধিত ও ৫,৯০১.২২২ টাকা দিয়ে রেসিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (আরইইউটিডিপি)।

পরবর্তী খবর

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: প্রতিবেশীর সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চ্যালেঞ্জ---প্রফেসর ড. আসিফ মিজান

| প্রকাশিত: ১২:৫৩ পূর্বাহ্ন, ১০ জুন ২০২৬



৪,১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত কেবল একটি ভৌগোলিক রেখামাত্র নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্নায়ুকেন্দ্র। সাম্প্রতিক সময়ে 'পুশইন' ও 'পুশব্যাক'-এর মতো একতরফা ও অনিয়মিত চর্চা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার জায়গাকে সংকীর্ণ করে তুলছে। আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিক বিবর্তনের আলোকে এই সংকটের গভীর বিশ্লেষণ এবং একটি টেকসই ও মানবিক রূপরেখা এখন সময়ের দাবি।


সম্পর্কের গভীরতা ও সীমান্তের রূঢ় বাস্তবতাঃ

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ইতিহাসে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক একটি অনন্য ও বহুমাত্রিক অধ্যায়। এই দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত কেবল দুটি দেশের মানচিত্রকেই পৃথক করেনি, বরং দুই ভূখণ্ডের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মনস্তত্ত্বকে এক সুতোয় বেঁধেছে। ঐতিহাসিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ককে প্রায়শই গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে এই সম্পর্কের অজস্র ইতিবাচক অর্জন থাকা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা- বিশেষ করে ‘পুশব্যাক’ (Pushback) এবং ‘পুশইন’ (Push-in)-এর ঘটনাপ্রবাহ- উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত দ্বন্দ্ব ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের জন্ম দিয়েছে। সমসাময়িক রাজনীতিতে এই দুটি প্রক্রিয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিতর্কিত রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তথাকথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ ঠেকানোর রাষ্ট্রীয় বয়ান, অন্যদিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার জাতীয় তাগিদ- এই দুইয়ের টানাপোড়েনে সীমান্তরেখা এখন এক অদৃশ্য অথচ অস্থির মনস্তাত্ত্বিক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।


পুশইন ও পুশব্যাকের তাত্ত্বিক ও আইনি ব্যবচ্ছেদঃ

আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অভিবাসন আইনের ক্ষেত্রে ‘পুশব্যাক’ এবং ‘পুশইন’ শব্দ দুটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত ও প্রায়োগিক অর্থ বহন করে, যা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

পুশব্যাক (Pushback): কোনো একটি রাষ্ট্র কর্তৃক তার সীমান্ত অতিক্রম করে আসা অনুপ্রবেশকারী, আশ্রয়প্রার্থী বা অভিবাসীদের কোনো ধরনের আইনি যাচাই-বাছাই, জুডিশিয়াল রিভিউ (আদালতি পর্যালোচনা) বা আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশে ফেরত পাঠানো।

 পুশইন (Push-in): এটি আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও একতরফা কৌশল। যখন কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে বসবাসকারী কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা বা দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল ছাড়াই, রাতের অন্ধকারে বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেয়, তখন তাকে ‘পুশইন’ বলা হয়।

আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের বৈশ্বিক মানদণ্ডে এই দুই প্রক্রিয়াই সম্পূর্ণ অবৈধ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো 'নন-রিফোলমেন্ট' (Non-refoulement) নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো দেশে বা পরিস্থিতিতে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা মানবাধিকার চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন (OHCHR) এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে, এই একতরফা চর্চা সরাসরি ''আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি' (ICCPR)'-এর চরম লঙ্ঘন, যা নো-ম্যানস ল্যান্ডে রাষ্ট্রহীনতার এক চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি করে।


সার্বভৌম ক্ষমতা ও আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির তাত্ত্বিক রূপরেখাঃ

সীমান্তের এই সংকটকে কেবল দুটি দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামোতে বিশ্লেষণ করলে এর তিনটি রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

>  আঞ্চলিক হেজিমনি বা আধিপত্যবাদ

>  বলপ্রয়োগের একতরফা রাজনীতি

>  'স্টেট অব এক্সেপশন' ও 'বেয়ার লাইফ'-এর অবতারণা


গ্রামসীয় হেজিমনি ও বলপ্রয়োগঃ

ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর 'হেজিমনি' (Hegemony) বা আধিপত্যবাদের তত্ত্বে দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কাঠামোগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিজের এজেন্ডা বজায় রাখে। ভারত যখন দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা কোনো আন্তর্জাতিক আইনি প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে একতরফাভাবে পুশব্যাক বা পুশইনের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন তা গ্রামসীয় তত্ত্বের 'বলপ্রয়োগের রাজনীতি'র রূপ পরিগ্রহ করে।


ফুকোর বায়োপলিটিক্স ও আগামবেনের স্টেট অব এক্সেপশনঃ

ফরাসি দার্শনিক 'মিশেল ফুকো'র 'বায়োপলিটিক্স' (Biopolitics) তত্ত্ব অনুযায়ী, আধুনিক রাষ্ট্র মানুষের জীবন, শরীর এবং জনসংখ্যাকে ক্ষমতার বলয়ে নিয়ন্ত্রণ করে। সীমান্তে পুশইন বা পুশব্যাকের শিকার মানুষদের রাষ্ট্র নিজের ক্ষমতার স্বার্থে 'অপছন্দনীয় জনসংখ্যা' হিসেবে চিহ্নিত করে। ইতালীয় দার্শনিক 'জর্জিও আগামবেন' এই ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্র যখন স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়াকে স্থগিত করে নিজের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তখন তাকে 'স্টেট অব এক্সেপশন' (State of Exception) বলা হয়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ড বা কাঁটাতারের মধ্যবর্তী অঞ্চলটি এমন এক আইনি শূন্যতার ক্ষেত্রে পরিণত হয়, যেখানে পুশব্যাকের শিকার মানুষগুলো পরিণত হয় 'বেয়ার লাইফ' (Bare Life) বা স্রেফ অধিকারহীন জীবে।


সংকটের ঐতিহাসিক বিবর্তনঃ

বর্তমান সীমান্ত সংকটের শিকড় প্রোথিত রয়েছে এই অঞ্চলের দীর্ঘ ও জটিল রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীরে। একে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা যায়ঃ


| ঐতিহাসিক পর্যায় | মূল ঘটনা ও প্রভাব | দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবস্থা |

১৯৪৭-এর দেশভাগ ও ১৯৭১: র‍্যাডক্লিফ লাইনের অবাস্তব সীমানা নির্ধারণ কোটি কোটি মানুষের জীবনকে দুই ভাগে বিভক্ত করে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এক কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী হয়, যার একটি বড় অংশের পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ সীমান্তের ওপারে থেকে যায়। 

ঐতিহাসিক নির্ভরশীলতা: জীবন ও সংস্কৃতির গভীর যোগাযোগ, তবে সীমানা নিয়ে এক ধরনের অন্তর্নিহিত অনিশ্চয়তা।

১৯৭৪-এর চুক্তি ও পরবর্তী শূন্যতা: ঐতিহাসিক 'ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তি'র দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১৫ সালে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়। এই দীর্ঘ অন্তর্বর্তী সময়ে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করে এবং সীমান্ত সুরক্ষাকে সম্পূর্ণ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শুরু করে। 

প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব: দ্বিপাক্ষিক চুক্তির দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও সীমান্ত সুরক্ষাকে একপাক্ষিক ও সামরিকায়িত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। |

২০০৩-বর্তমান (পুশব্যাক ও সংকট): ২০০৩ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন এনডিএ সরকারের আমলে সাতক্ষীরা ও যশোর সীমান্তে কয়েকশ বাংলাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক পুশব্যাক করার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা তৎকালীন বিডিআর ও বিএসএফ-এর মধ্যে তীব্র সংঘাতের জন্ম দেয়। বর্তমানে এনআরসি (NRC) ও সিএএ (CAA) এর কারণে এই সংকট তীব্রতর হয়েছে। 

কাঠামোগত দ্বন্দ্ব: একতরফা বলপ্রয়োগ, মানবাধিকার সংকট ও দ্বিপাক্ষিক ডিপ্লোম্যাটিক অনাস্থার ক্রমান্বয় বৃদ্ধি।


সংকটের বহুমুখী চালিকাশক্তিঃ

এই সীমান্ত সংকটের পেছনে মূলত তিনটি চালিকাশক্তি কাজ করছে:

১. ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আইনি রূপান্তর: বিশেষ করে আসাম রাজ্যে বাস্তবায়িত 'জাতীয় নাগরিক পঞ্জি' (NRC) এবং পরবর্তীতে দেশজুড়ে প্রণীত 'নাগরিকত্ব সংশোধন আইন' (CAA) এই সংকটকে তীব্রতর করেছে। ভোটার তালিকা এবং জনমিতিক ভারসাম্যকে কেন্দ্র করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই অনুপ্রবেশের অভিযোগকে একটি সংবেদনশীল নির্বাচনি ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

২. সীমান্ত প্রশাসনের কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্য: ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) এই সীমান্তকে একটি 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ' অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং মানব পাচার রোধে প্রায়শই একতরফা ও আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করে। অন্যদিকে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB) এর অবস্থান হলো—কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব যথাযথ আইনি উপায়ে ও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

৩. তৃণমূল পর্যায়ের সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা: বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দুই পাশেই বিপুলসংখ্যক দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের বসবাস। ভৌগোলিক সান্নিধ্য এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বাভাবিক যাতায়াত ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ভারত যখন এই জটিল সামাজিক-অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কটিকে স্রেফ একটি 'জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি' হিসেবে দেখে এবং ঢালাওভাবে পুশব্যাকের নীতি প্রয়োগ করে, তখন তা সাধারণ মানুষের জীবনকে চরমuncertainty বা অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।


ভারতীয় কূটনীতির দ্বিমুখী আচরণ: ফরমাল বনাম ইনফরমাল প্র্যাকটিসঃ

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় সংকট হলো তার প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক (Formal) প্রতিশ্রুতির সাথে মাঠপর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল (Informal) আচরণের বৈপরীত্য।

কূটনৈতিক অসঙ্গতি: দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে ভারত এবং বাংলাদেশ যখন যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করে, তখন "পারস্পরিক সহযোগিতা", "সীমান্তে শূন্য মৃত্যু" কিংবা "শান্তিপূর্ণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা"র মতো গালভরা আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক বাস্তবতায় দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। কোনো পূর্ব ঘোষণা, আইনি নোটিশ বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রটোকল ছাড়াই রাতের অন্ধকারে বিএসএফের মাধ্যমে পুশইন বা পুশব্যাকের মতো একতরফা পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

ভারতের এই অনানুষ্ঠানিক আচরণ তার প্রতিবেশীদের সাথে 'প্যারেন্টাল' বা অভিভাবকসুলভ এবং ক্ষেত্রবিশেষে বলদর্পী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এই দ্বিমুখী আচরণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে এবং প্রমাণ করে যে, কৌশলগত অংশীদারিত্বের নানামুখী অর্থনৈতিক ও সামরিক চুক্তি সত্ত্বেও, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল জায়গায় ভারত এখনও হেজিমনিক বা একতরফা নীতিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।


ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর প্রভাবঃ

এই একতরফা বলপ্রয়োগের নীতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলে এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের কাঠামোগত অনাস্থা তৈরি করে, যা সার্বভৌম সমতার আন্তর্জাতিক নীতিকে সংকুচিত করে ফেলে। এর প্রভাব মূলত দুটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান:

আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তন: বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক (Factor)। ভারতের একতরফা পুশইন ও পুশব্যাকের নীতি যখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে সংকটের মুখে ফেলে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার তাগিদ তৈরি হয়। এই অঞ্চলের অপর বৃহৎ শক্তি চীন যখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে একটি বড় অংশীদার, তখন সীমান্তে ভারতের এই অনমনীয় মনোভাব ঢাকাকে বেইজিংয়ের কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়তে উৎসাহিত করতে পারে।

জনমানসে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বঃ 

সীমান্তে পুশইনের শিকার নারী, শিশু এবং অসহায় মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র যখন গণমাধ্যমে উঠে আসে, তখন তা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এর সাথে যুক্ত হয় দীর্ঘদিনের সীমান্ত হত্যার বেদনাদায়ক ইতিহাস। এই মানবিক বিপর্যয়গুলো বাংলাদেশের জনমানসে একটি স্থায়ী 'ভারত-বিরোধী' বয়ান বা ন্যারেটিভকে শক্তিশালী করে, যা দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের বাণিজ্য, ট্রানজিট, এবং তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক যৌথ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে জটিল ও বাধাগ্রস্ত করে তোলে।


সংকট উত্তরণে বহুমাত্রিক সুপারিশমালাঃ

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইন ও পুশব্যাকের মতো জটিল ও সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একতরফা আধিপত্যবাদী মানসিকতা পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই এবং মানবিক কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। এই সংকট উত্তরণের কৌশলগত রোডম্যাপ হতে পারে নিম্নরূপ:


[সার্বভৌম সমতা] ➔ [স্বচ্ছ প্রত্যর্পণ চুক্তি] ➔ [যৌথ সীমান্ত টহল] ➔ [মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি]


১. সার্বভৌম সমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা:

ভারতকে 'আঞ্চলিক হেজিমন' বা একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার নীতি থেকে সরে এসে সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সাথে কাজ করতে হবে। বিএসএফ এবং বিজিবি-এর মধ্যে মাঠপর্যায়ে কেবল আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠক নয়, বরং রিয়াল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ টহলের মাধ্যমে সীমান্তকে একটি 'শান্তি অঞ্চল' হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

২. দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি (Legal Deportation Treaty) যথাযথ অনুসরণ:

যদি কোনো দেশে আসলেই কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল অনুযায়ী তার নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। রাতের অন্ধকারে জোরপূর্বক পুশইন করার পরিবর্তে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে স্বচ্ছ এবং আইনি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

৩. আন্তর্জাতিক মানবিক মানদণ্ডের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ:

উভয় রাষ্ট্রকেই জাতিসংঘের 'নো-ম্যানস ল্যান্ড' নীতি এবং মানবাধিকারের বৈশ্বিক সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। নো-ম্যানস ল্যান্ডে মানুষকে আটকে রেখে রাষ্ট্রহীন বা অধিকারহীন জীবে পরিণত করার নিষ্ঠুর চর্চা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সীমান্ত সুরক্ষাকে স্রেফ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে এর একটি মানবিক রূপ দেওয়া অপরিহার্য।

৪. উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংলাপ:

সীমান্ত হত্যা এবং পুশব্যাকের মতো ঘটনাগুলো দুই দেশের সামগ্রিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে স্থবির করে দেয়। তাই নিয়মিত বিরতিতে যৌথ পরামর্শক কমিশন (JCC) এবং শীর্ষ রাজনৈতিক পর্যায়ে এই নির্দিষ্ট এজেন্ডাটি নিয়ে খোলামেলা ও গঠনমূলক সংলাপের আয়োজন করতে হবে, যা দুই দেশের মধ্যকার অনাস্থার সংকট দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।


পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌম সমতার ভবিষ্যৎঃ

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের পুশইন ও পুশব্যাকের ভূ-রাজনীতি কেবল একটি ভূখণ্ডগত বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আইনি দ্বন্দ্ব নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার অসমতা এবং রাষ্ট্রীয় আধিপত্যবাদের এক বাস্তব প্রতিফলন। একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ অঞ্চলের স্বার্থে দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার সম্পর্ক একতরফা বলপ্রয়োগের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকতে পারে না।

ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক বন্ধনে আবদ্ধ এই দুই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌম সমতার নীতির ওপর নির্ভরশীল। সীমান্তে মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং পুশইন ও পুশব্যাকের মতো সংকটগুলোর কূটনৈতিক ও আইনি সমাধানের মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রকৃত 'সুবর্ণ অধ্যায়' নিশ্চিত করা সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।


লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

পরবর্তী খবর

ভারতের কুৎসিত চেহারা---অধ্যাপক ড. শেখ আকরাম আলী

| প্রকাশিত: ১০:৩৩ অপরাহ্ন, ০৯ জুন ২০২৬



সমগ্র জাতির সামনে ভারতের কুৎসিত চেহারা আজ নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়েছে। ভারত কখনোই ভালো বন্ধু ছিল না, তবে সর্বদা বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হওয়ার ভান করেছে। সমাজের একশ্রেণীর মানুষ মনে করে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ভারতের সমর্থন ব্যাপকভাবে অবদান রেখেছিল এবং এই শ্রেণীর মানুষ ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ভারতের কুৎসিত ভূমিকা ভুলে গিয়ে তাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকতে চায়। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্য করেছিল কেবল পাকিস্তানকে ভেঙে একটি আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র (ক্লাইন্ট স্টেট) বাংলাদেশ তৈরি করার দীর্ঘদিনের লালিত ইচ্ছা পূরণ করতে।


হিন্দুপ্রধান ভারত কখনোই মুসলমানদের পছন্দ করেনি এবং ব্রিটিশ আমলের পুরোটা সময়জুড়েই তাদের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা তাদের ভাই মনে করত, সেখানে হিন্দু সম্প্রদায় ভারতের মাটি থেকে মুসলিম জনসংখ্যাকে নির্মূল করার জন্য গোপনে কাজ করেছিল। সৌভাগ্যবশত, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম নেতারা তাদের এই চক্রান্ত বুঝতে পেরেছিলেন এবং ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য একটি পৃথক জন্মভূমি তৈরি করে তাঁর সম্প্রদায়কে ন্যাশনাল কংগ্রেসের আধিপত্যবাদী নিয়ন্ত্রণ থেকে রক্ষা করেছিলেন।


কংগ্রেস নেতারা ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ মেনে নেননি এবং শুরু থেকেই তা ভেঙে ফেলার জন্য সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। তারা পাকিস্তানকে থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র শুরু করে এবং এর জন্মের চব্বিশ বছরের মধ্যে তারা সফল হয়। আমাদের নেতারা ভারতের এই গোপন উদ্দেশ্য উন্মোচন করতে ব্যর্থ হন এবং তারা তাদের জাতীয় অখণ্ডতার কথা ভুলে গিয়ে ভারতের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাদের মূল্যবান অংশীদারে পরিণত হন।

ভারতের রাজনৈতিক নেতারা পূর্ব পাকিস্তানের নির্বোধ নেতাদের সাথে মোকাবিলা করার মতো যথেষ্ট পরিপক্ক ছিলেন এবং শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদের তথাকথিত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু করার জন্য তাদের অধিকাংশকেই ম্যানেজ করতে সক্ষম হন। এই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনটি গোপনে ভারত সরকার দ্বারা সমর্থিত ছিল এবং তারা আওয়ামী নেতাদের সাথে, বিশেষ করে শেখ মুজিবের সাথে একটি গোপন চুক্তিতে এসেছিল যা আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে পরিচিত। ভারতের কুৎসিত নজর পাকিস্তানের ওপর পড়ে এবং তারা তাদের কাজে তৎপর হয়ে ওঠে।


পাকিস্তান সরকার এই ষড়যন্ত্রের সূত্র খুঁজে পায় এবং শেখ মুজিবকে কারাবন্দী করে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটি দেশের একটি আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়, কিন্তু আইয়ুব সরকার এর বিরুদ্ধে সঠিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হয়ে ওঠেন। পাকিস্তানের নির্বোধ আওয়ামী নেতা এবং অপূর্ণাঙ্গ সামরিক-রাজনৈতিক অভিজাতরা ভারতীয় ষড়যন্ত্রের শিকার হন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের জন্মের মাধ্যমে তা সফল হয়। ইন্দিরা গান্ধী নিজেকে একজন সফল কূটনীতিক হিসেবে প্রমাণ করেন, যিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের (USSR) সমর্থনে মাত্র নয় মাসের সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে এটি সম্ভব করেছিলেন।


আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক বৈষম্যের মিথ্যা অভিযোগে পুরো বাঙালি জনগোষ্ঠীকে আচ্ছন্ন (হিপনোটাইজড) করে রাখা হয়েছিল। আইয়ুব খানের তথাকথিত রাজনৈতিক সরকার ভারতের গোপনে সমর্থিত আওয়ামী লীগের এই মিথ্যা প্রচারণার বিরুদ্ধে কোনো পাল্টা আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। অথচ প্রকৃত তথ্য ছিল ভিন্ন এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সব অবকাঠামোগত উন্নয়ন আইয়ুবের উন্নয়নের দশকের (১৯৫৮-১৯৬৯) সময়েই ঘটেছিল।

এখন এটি একেবারেই স্পষ্ট যে পুরো খেলাটিই ছিল পাকিস্তান ভাঙার পেছনে ভারতীয় ষড়যন্ত্রের ফল। শেখ মুজিব নিজেই আগরতলা ষড়যন্ত্রের সত্যতা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। স্বাধীনতার অতিকথা (মিথ) এবং বাংলাদেশের জন্মলগ্নে ভারতের সম্পৃক্ততা একটি ঐতিহাসিক সত্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিদিন ভারতের কুৎসিত চেহারা উন্মোচিত হচ্ছে।


জিয়াউর রহমানই ভারতের এই কুমতলব ও কুৎসিত চেহারাটি ধরতে পেরেছিলেন এবং এর মুখোমুখি হওয়ার জন্য সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, কিন্তু ভারতের স্থানীয় এজেন্টরা তাদের নির্দেশে ১৯৮১ সালের মে মাসে তাঁকে হত্যা করে। তবে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে দেশের জন্য অনেক কিছু করে গেছেন। বাংলাদেশী জাতি এই মহান নেতাকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে এবং জাতি আজও তাঁর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির চেতনায় উদ্বুদ্ধ।


এরশাদের শাসনামলে বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারত তার কুৎসিত চেহারা দেখাতে কখনো কুণ্ঠাবোধ করেনি এবং সর্বদা ‘দাদাগিরি’ বা বড় ভাইয়ের মতো আচরণ বজায় রেখেছিল। যদিও বেগম খালেদা জিয়া ভারতের সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সফল হয়েছিলেন, তবুও তিনি ভারতের এই কুৎসিত চেহারার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন এবং এর শিকার হন।


মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকার ছিল ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ উদ্যোগের ফল। সেই সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভারত আবারও তার কুৎসিত চেহারা নিয়ে হাজির হয় এবং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসাতে সফল হয়। এর ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্রীড়াক্ষেত্র সম্পূর্ণভাবে ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়; ভারত নিজেকে প্রভুর ভূমিকায় অবতীর্ণ করে এবং বাংলাদেশ কার্যত ভারতের একটি আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রে (ক্লাইন্ট স্টেট) পরিণত হয়।

গত ১৬ বছর ধরে সমগ্র জাতি ভারতের হাতে জিম্মি ছিল এবং ভারতের কুৎসিত রূপ প্রত্যক্ষ করেছে। ভারত এ দেশের ওপর তার আধিপত্যবাদী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং শেখ হাসিনার সরকারকে একটি পুতুল সরকারে পরিণত করেছিল।


কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব সফলভাবে ভারতের কুৎসিত চেহারা উন্মোচন করেছে এবং শেখ হাসিনার পুতুল সরকারকে উৎখাত করে বাংলাদেশকে তার আধিপত্যবাদী নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করেছে। এটি কোনো সহজ কাজ ছিল না, তবে ঐশ্বরিক আশীর্বাদে এটি সত্যি হয়েছে। বাংলাদেশের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভারত আক্ষরিক অর্থেই ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে এবং বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কিছু অ diplomatic (কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত) পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটি বিশাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন বা অপপ্রচার শুরু করা হয় এবং ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ক্রমাগত হুমকির মুখে রাখা হয়।


ভারত বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় সৈন্য সমাবেশ করেছে এবং কোনো এক গোপন ও অসৎ উদ্দেশ্যে সেখানে কয়েকটি নতুন সেনানিবাস নির্মাণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে তারা বাংলাদেশে মানুষ পুশ-ইন করার (অনুপ্রবেশ করানোর) চেষ্টা করছে। এটি মোটেও ভালো লক্ষণ নয় এবং দেশের বর্তমান শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য তাদের কোনো মহাপরিকল্পনা থাকতে পারে।


সরকারকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে এবং ভারতের যেকোনো উদ্যোগের মুখোমুখি হতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; যেকোনো মূল্যে তাদের এই অপচেষ্টা নস্যাৎ করতে হবে। জাতিকে অবশ্যই জুলাইয়ের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং নিকট ভবিষ্যতে ভারত যদি এমন কোনো চেষ্টা চালায়, তবে তাদের সেই হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।


এখন পর্যন্ত বর্তমান সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো প্রশংসনীয় এবং তাদের এটি সম্পূর্ণ স্পষ্ট করতে হবে যে—সরকার জাতীয় স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্ভাব্য সবকিছু করবে। বর্তমান পররাষ্ট্র মন্ত্রী পেশাদারিত্বের সাথে ভারতকে সামলানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট যোগ্য এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি (President of the UN General Assembly) নির্বাচিত হয়ে তিনি ইতিমধ্যেই তা প্রমাণ করেছেন। বাংলাদেশ বিরোধী ভোট দিয়ে ভারত আবারও তার কুৎসিত চেহারা উন্মোচন করেছে।

যেকোনো সংকটের সময়ে যারা পাশে দাঁড়াতে সক্ষম, এমন দেশগুলোর সাথে আর সময় নষ্ট না করে আক্রমণাত্মক বা জোরালো কূটনৈতিক সম্পর্ক (Aggressive diplomacy) গড়ে তুলতে হবে। তুরস্ক এবং পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ভবিষ্যতে ভারতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিশ্চিতভাবেই আমাদের হাতকে শক্তিশালী করবে। ভারতের এই কুৎসিত চেহারার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত, যাতে বাংলাদেশের মানুষকে এটি দেখানোর আগে সে দুইবার ভাবতে বাধ্য হয়। জনগণের ঐক্যই আমাদের মূল পরাশক্তি।


সম্পাদক, মিলিটারি হিস্ট্রি জার্নাল।

০৯ জুন, ২০২৬

পরবর্তী খবর

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার সাক্ষাৎ

| প্রকাশিত: ৩:০২ অপরাহ্ন, ০৯ জুন ২০২৬

বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) বেলা সাড়ে ১১টায় বিরোধীদলীয় নেতার কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সাক্ষাৎকালে নির্বাচন-পরবর্তী দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আসন্ন জাতীয় বাজেট, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও সুশাসনসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।

এছাড়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের বিকাশ, সুশাসন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয় নিয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। উভয়পক্ষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বিদ্যমান সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান এমপি এবং পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা টিমের সদস্য আলী আহমাদ মাবরুর উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দূতাবাসের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাউন্সেলর এরিক গিলান এবং রাজনৈতিক কর্মকর্তা হারমানোশি বার্নার্ড।

পরবর্তী খবর

বাজেটে থাকছে বিশেষ বরাদ্দ: শিগগিরই জারি হতে যাচ্ছে নবম পে-স্কেলের গেজেট

| প্রকাশিত: ২:৫৫ অপরাহ্ন, ০৯ জুন ২০২৬

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে-স্কেল আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকরের লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়ার পর পরই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন (গেজেট) জারি করা হবে।

নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই নবম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর করতে জুন মাসের মধ্যেই গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে আসন্ন বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পুরো কমিশনের সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে এক লাখ কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হওয়ায় সরকার ধাপে ধাপে এটি কার্যকর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল থাকবে। সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এছাড়া নতুন পে-স্কেলের আওতায় প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীকেও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে পেনশন সর্বোচ্চ ১০০% পর্যন্ত হারে বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে আগামী ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের প্রায় ৫০% বৃদ্ধি কার্যকর হতে পারে। পরবর্তী ২ বছরে বাকি অংশ সমন্বয় করা হবে।

এদিকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ। বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠনের দাবি, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হলে নতুন পে-স্কেল এক ধাপে এবং শতভাগ বেতন বৃদ্ধিসহ কার্যকর করতে হবে।

পরবর্তী খবর

সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় গঠনের রায় স্থগিত

| প্রকাশিত: ২:৫৩ অপরাহ্ন, ০৯ জুন ২০২৬

সুপ্রিম কোর্টের জন্য তিন মাসের মধ্যে আলাদা স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় স্থগিত করেছে আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে এই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানির জন্য আগামী ১৬ জুন দিন নির্ধারণ করেছে আদালত। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত থাকবে।

মঙ্গলবার (৯ জুন) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

এদিন সকালে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল শুনানি শুরু হয়। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।

এর আগে গত ২১ মে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিলো রাষ্ট্রপক্ষ। গত সাত এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়।

গত বছরের দুই সেপ্টেম্বর বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দিয়েছিলেন। রায়ে অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকা সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বিধানটি বাতিল করে হাইকোর্ট। ফলে অধস্তন আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হয়। একই সঙ্গে অধস্তন আদালতের জন্য ২০১৭ সালে করা শৃঙ্খলাবিধিও বাতিল ঘোষণা করেন আদালত।

২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ ও ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং বিচার বিভাগীয় আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাতজন আইনজীবী একটি রিট দায়ের করেন। এরপর একই বছরের ২৭ অক্টোবর হাইকোর্ট এ বিষয়ে রুল জারি করেছিলেন।

পরবর্তী খবর

স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কেউ ব্যক্তিগতভাবে দাঁড়ালে বাধা নেই: তথ্য উপদেষ্টা

| প্রকাশিত: ২:৫২ অপরাহ্ন, ০৯ জুন ২০২৬

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কেউ যদি দলীয় পরিচয় ছাড়া, এককভাবে বা ব্যক্তি হিসেবে অংশ নিতে চান, তবে তাতে সরকার কোনো বাধা দেবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তবে সরকার দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার পক্ষে। 

মঙ্গলবার (৯ জুন) এক নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ব্যক্তি হিসেবে একজন যদি নির্বাচনে অংশ নিতে চান, সেটা নিয়ে কোনো সঙ্কট হবে না। কারণ সেটা দলীয় পরিচয় হবে না।

তবে দলীয় ব্যানারে যেকোনো তৎপরতার বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আছে। এই সরকার চায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাক। এর মাঝে কোনো কিছু (দলীয় কার্যক্রম) হলে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরে আনতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ বা ‘পুশইন’ নিয়ে তৈরি হওয়া আলোচনার বিষয়েও কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা। ভারতের নয়াদিল্লিতে চলমান চার দিনব্যাপী বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকের পটভূমিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে চাপে রাখতে ভারত পুশইন করছে না। এটি মূলত সেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব। তবে পাঁচ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে দুই দেশই এখন সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায়।

দেশের অর্থনীতি প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সম্প্রতি দাম বাড়ানোর পরেও বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় দেশে জ্বালানি তেলের দাম এখনও কম রয়েছে। এ সময় বিগত আমলের তুলনা টেনে তিনি দাবি করেন, বিএনপির সময় কখনও শেয়ারবাজারে অস্থিরতা বা সমস্যা ছিলো না, যা আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেখা গেছে।

পরবর্তী খবর

দুই দশক পর কক্সবাজার যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

| প্রকাশিত: ১২:২৯ অপরাহ্ন, ০৯ জুন ২০২৬

কক্সবাজার সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার (১৩ জুন) রাতে কক্সবাজারের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন তিনি। আবার রবিবার রাতে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেবেন।

চারদলীয় জোট আমলে দলের হয়ে কক্সবাজার যাওয়ার প্রায় দুই দশক পর আবার কক্সবাজার যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসন ও দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে ব্যাপক তৎপরতা ও প্রাণচাঞ্চল্য শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনালে আয়োজিত জনসভার মাঠ এবং নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান, কক্সবাজারে খালখনন উদ্বোধনসহ সার্বিক পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন মন্ত্রী, সচিব ও জেলা প্রশাসন।

শুক্রবার (৫ জুন) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চকরিয়ায় পৌঁছে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান ও পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে চকরিয়া পৌরসভার বাস টার্মিনাল মাঠ, চকরিয়া উপজেলা এবং মাতামুহুরী উপজেলার নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণে বিবেচিত এলাকাগুলো ঘুরে দেখেন। জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়ে পাতলিখাল খনন স্থান পরিদর্শন করে গেছেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ।

জেলা বিএনপি ও প্রশাসনের সূত্রমতে, ১৩ জুন রাত ৮টার বিমানে কক্সবাজারের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন প্রধানমন্ত্রী। রাতে কক্সবাজার সার্কিট হাউজে অবস্থানের পর ১৪ জুন সারাদিনের টাইট প্রোগ্রাম রাখা হয়েছে। এদিন বেলা ১১টায় কক্সবাজার সদরের পিএমখালীতে ৪৮ বছর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খনন করা পাতলিখাল পুনঃখনন উদ্বোধন এবং সংক্ষিপ্ত পথসভা করবেন তিনি।

দুপুর ১২টায় যাবেন ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক। সেখানে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সূচনা এবং পার্ক ঘুরে দেখবেন। এরপর যাবেন জুলাই-২৪ আন্দোলনে কক্সবাজারের প্রথম শহীদ ওয়াসিমের কবর জেয়ারতে। জেয়ারত শেষে মাতামুহুরী উপজেলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং পরে পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর জোহরের নামাজ-ভোজ ও বিশ্রাম শেষে বিকেল ৪টায় যাবেন চকরিয়ায় বিএনপি জনসভায়।

চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনাল মাঠে স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। জনসভা শেষে সন্ধ্যায় কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ ও সৈকত পরিদর্শন করবেন তিনি। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কক্সবাজারের সুধীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় মিলিত হয়ে রাত ৯টার বিমানে ঢাকার উদ্দেশে কক্সবাজার ত্যাগ করবেন তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রীর চকরিয়া-পেকুয়া সফর ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার সঙ্গে থাকবেন চকরিয়া-পেকুয়া (কক্সবাজার-১) আসনের সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, কক্সবাজার-৩ সদর আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল প্রমুখ।জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক ইউছুপ বদরী বলেন, ‌‘প্রায় দুই দশক আগে চারদলীয় জোট আমলে কক্সবাজার এসেছিলেন তারেক রহমান। কিন্তু এখন আসছেন প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান হয়ে। এজন্য আমাদের উচ্ছ্বাসটা একটু বেশি।’

পরবর্তী খবর

সালিশে বসে ছুরিকাঘাত, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিহত

| প্রকাশিত: ১১:৪২ অপরাহ্ন, ০৮ জুন ২০২৬

রাজধানীর মৌচাক এলাকায় ছুরিকাঘাতে বিল্লাল হোসেন তালুকদার (৫৭) নামে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। ভাগনেকে মারধরের ঘটনায় সেখানে এক সালিশি বৈঠকে উপস্থিতি হয়েছিলেন তিনি। সেখানেই ঘটে ছুরিকাঘাতের ঘটনা।

সোমবার (৮ জুন) রাত ৮টার দিকে মৌচাকের আনারকলি মার্কেটের সামনে এ ঘটনা ঘটে। ছুরিকাঘাতের পর বিল্লালকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাত ৯টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত বিল্লাল হোসেন তালুকদার স্বেচ্ছাসেবক দলের রমনা থানার সাবেক আহ্বায়ক। তার বাড়ি মালিবাগের বাগানবাড়ি এলাকায়। সেখানে বালু ও সিমেন্টের ব্যবসা করতেন তিনি। তার বাবা মৃত ইউনুছ তালুকদার।


বিল্লালের ভাগনে মো. মোবারক হোসেন আকাশ জানান, আনারকলি মার্কেটের সামনে সন্ধ্যায় তাকে কয়েকজন মারধর করেন। মারধরে শিকার হয়ে তিনি মামা বিল্লাল হোসেনকে ডেকে নেন। যুবদলের রমনা থানার আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবু ও সাধারণ সম্পাদক লুৎফরের উপস্থিতিতে সেখানে সন্ধ্যার মারধর নিয়ে সালিশ বৈঠক হয়।

আকাশ আরও জানান, বৈঠকের মধ্যেই বিল্লাল এবং বাবু-লুৎফরের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে বাবুর অনুসারীরা বিল্লালকে বুকে ছুরিকাঘাত করেন।

ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, ছুরিকাঘাতে আহত অবস্থায় একজনকে ঢামেক হাসপাতালে আনা হয়েছিল। চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেছেন। তার বুকে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মরদেহটি মর্গে রাখা হয়েছে।


পরবর্তী খবর

ভাঙা আয়নায় শিক্ষকের মর্যাদা: গাফিলতি না সুনিয়ন্ত্রিত ষড়যন্ত্র?--প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান

| প্রকাশিত: ৫:৪০ অপরাহ্ন, ০৮ জুন ২০২৬



জাতীয় জীবনের মূল ভিত্তিপ্রস্তর হলো শিক্ষা। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো একটি জাতির মৌলিক গবেষণা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বিনির্মাণের সুতিকাগার। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক বা উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগের প্রক্রিয়াটি কেবল কোনো রুটিনমাফিক প্রশাসনিক কাজ হতে পারে না; এটি রাষ্ট্রের প্রতি এক পবিত্র ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা। যেখানে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, মেধা ও নৈতিকতার নূন্যতম বিচ্যুতি ঘটে, সেখানে পুরো উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপরই জনমনে গভীর অনাস্থা তৈরি হয়। **জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়**-এর উপাচার্য নিয়োগের সাম্প্রতিক ঘটনাটি কেবল একটি প্রশাসনিক 'ভুল' বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; এটি মূলত আমলাতান্ত্রিক অবক্ষয়, প্রাতিষ্ঠানিক নৈরাজ্য এবং মেধার প্রতি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

কী ঘটল: একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রহসনের চালচিত্রঃ

সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদকে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে মনোনীত ও প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে, দীর্ঘ ২৩ দিন পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সেই প্রজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করে নেয় এবং দাবি করে—ঘটনাটি 'অনবধানতাবশত' বা ভুলক্রমে ঘটেছে।

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরের একটি প্রজ্ঞাপন জারির পূর্বে নথিগুলো যেভাবে বহুস্তরীয় যাচাই-বাছাই, স্ক্রুটিনি এবং নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনে পৌঁছায়—সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বা শিক্ষকের নাম বদলে যাওয়ার মতো মৌলিক ভ্রান্তি কীভাবে সম্ভব, তা যেকোনো সচেতন নাগরিককে স্তম্ভিত করে। ২৩ দিন ধরে একটি প্রজ্ঞাপন বহাল থাকা এবং পরবর্তীতে কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও আইনি ব্যাখ্যা ছাড়াই তা প্রত্যাহার করা কি কেবলই প্রশাসনিক অদক্ষতা? নাকি এর পেছনে কাজ করেছে কোনো গভীর মনস্তাত্ত্বিক খেলা কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের অদৃশ্য রথচালনা—তা আজ বড় প্রশ্ন।

মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দিক: একজন শিক্ষকের সামাজিক লাঞ্ছনাঃ

এই পুরো নাটকের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন একজন সম্মানিত অধ্যাপক, গবেষক এবং মানুষ গড়ার কারিগর। একটি রাষ্ট্রীয় ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর তা আকস্মিকভাবে প্রত্যাহার করা মানে কেবল একটি প্রজ্ঞাপন বাতিল করা নয়; বরং একঝটকায় সেই শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত সুনাম এবং দীর্ঘদিনের অর্জিত অ্যাকাডেমিক আত্মসম্মানকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া।

আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষকের স্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল ও শ্রদ্ধার। ফলে, এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ একজন শিক্ষাবিদকে তীব্র মানসিক ট্রমা, সামাজিক অপদস্থতা এবং পেশাগত বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়। এই অপূরণীয় মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ক্ষতির দায়ভার রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কীভাবে এড়াতে পারে?

আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ও তদন্তের অনিবার্যতাঃ

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ফাইল রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী মহলের বহু টেবিল ঘোরে, একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর পেরিয়ে চূড়ান্ত রূপ নেয়। এতগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ফিল্টার থাকার পরও যদি ২৩ দিন পর ত্রুটি ধরা পড়ে, তবে বুঝতে হবে আমাদের 'চেইন অব কমান্ড' এবং আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহিতার ভিত্তি কতটা নড়বড়ে।

কার্যকর ও পক্ষপাতহীন তদন্ত ছাড়া এই প্রাতিষ্ঠানিক কলঙ্ক মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তাই আমাদের দাবিঃ-

বিচার বিভাগীয় তদন্ত: সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং সময়নির্ধারিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।

জনসমক্ষে প্রতিবেদন: তদন্ত প্রতিবেদনটি কোনো গোপন দপ্তরে চেপে না রেখে সম্পূর্ণ জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: এই ঘটনার পেছনের কুশীলব, আমলা বা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের চিহ্নিত করে বিভাগীয় ও আইনগত কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

তথ্য অধিকারের প্রয়োগ: তদন্ত প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার তথ্য গোপনের চেষ্টা করা হলে, তা তথ্য অধিকার আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

সুশীল সমাজ ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর 'কৌশলী নীরবতা' এক নৈতিক দেউলিয়াত্বঃ

এই ঘটনার আরেকটি সবচেয়ে দুঃখজনক অধ্যায় হলো দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের রহস্যজনক নীরবতা। যারা সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং মেধার অধিকার রক্ষায় সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ হওয়ার কথা ছিল, তাদের এই আপাতঃনিস্পৃহতা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।

"অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা বজায় রাখা প্রকারান্তরে সেই অন্যায়কে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়ারই শামিল।"

মেধা ও মর্যাদার এই প্রকাশ্য অবমাননার মুখে শিক্ষক সংগঠনগুলোর এই দলীয় বা কৌশলগত নীরবতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা দিচ্ছে। জনস্বার্থে এবং শিক্ষক সমাজের অস্তিত্বের স্বার্থেই এই নীরবতা ভাঙা জরুরি।

মেধার অবমাননা: উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ সংকটঃ

যাঁকে এই পদের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল, তিনি কোনো সাধারণ অনুকম্পাপ্রাপ্ত ব্যক্তি নন; তিনি তাঁর মেধা, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণে সমাদৃত। তাঁর মতো একজন যোগ্য মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ মূলত দেশের সামগ্রিক মেধা চর্চার ওপর এক বড় আঘাত।

যদি যোগ্যতা, সততা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা রাষ্ট্রীয়ভাবে সুরক্ষিত না হয়, তবে আমাদের তরুণ ও প্রতিভাবান গবেষকেরা কেন দেশীয় অ্যাকাডেমিয়ায় অবদান রাখতে উদ্বুদ্ধ হবেন? এর সুদূরপ্রসারী ফল হিসেবে উচ্চশিক্ষা খাত আরও বেশি মেধাশূন্য ও মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়বে।

কাঠামোগত সংস্কার ও বাস্তবসম্মত প্রস্তাবনাঃ

ভবিষ্যতে এই ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশাসনিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমূল সংস্কার আনা অপরিহার্য:

১. ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও অডিট ট্রেইল: রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও প্রজ্ঞাপন প্রক্রিয়াকরণে শতভাগ ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হোক, যেন প্রতিটি ফাইলের গতিবিধি ও পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট কর্মকর্তা ডিজিটালভাবে দায়বদ্ধ থাকেন।

২. স্বাধীন সার্চ কমিটি ও স্ক্রুটিনি বোর্ড: উপাচার্য নিয়োগের জন্য দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে একটি তিন স্তরের স্বাধীন সার্চ কমিটি এবং বহুপাক্ষিক স্ক্রুটিনি বোর্ড গঠন করতে হবে।

৩. সিটিজেন ওয়াচডগ বা নাগরিক পর্যবেক্ষণ মঞ্চ: উচ্চশিক্ষার স্বচ্ছতা, শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা তদারকির জন্য শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন 'নাগরিক পর্যবেক্ষণ মঞ্চ' গঠন করা প্রয়োজন।

৪. প্রকাশ্য দুঃখপ্রকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বাসন: যে যোগ্য শিক্ষাবিদকে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সামাজিকভাবে হেয় করা হয়েছে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ও জনসমক্ষে দুঃখপ্রকাশ করতে হবে এবং তাঁর যোগ্য মর্যাদায় তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।


জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে ঘটে যাওয়া এই নাটকটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ভুল নয়; এটি আমাদের ভঙ্গুর প্রশাসনিক নীতি, অস্বচ্ছ আমলাতন্ত্র এবং মেধার প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। আমরা অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। রাষ্ট্রীয় পদগুলো যদি মেধা, যোগ্যতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে পরিচালিত না হয়ে আমলাতান্ত্রিক খেয়ালখুশির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে 'ভাঙা আয়নায়' আমরা বারবার কেবল আমাদের জাতীয় অবক্ষয়ের কদর্য রূপটিই দেখতে বাধ্য হবো।


লেখক পরিচিতিঃ

প্রফেশনাল ড. শেখ আসিফ এস. মিজান, ভাইস-চ্যান্সেলর, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, মোগাদিসু, সোমালিয়া ও রাজনীতি বিশ্লেষক।

পরবর্তী খবর

এসএসসির ফলাফল প্রকাশ ২০ জুলাই: শিক্ষামন্ত্রী

| প্রকাশিত: ৫:২২ অপরাহ্ন, ০৮ জুন ২০২৬

চলতি বছরের মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল আগামী ২০ জুলাই প্রকাশিত হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

সোমবার (৮ জুন) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। জাতীয় পর্যায়ের স্টার্টআপ, বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবনী ধারণা প্রদর্শনী, প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মসূচি উপলক্ষ্যে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

ফল প্রকাশের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল ২০ জুলাই প্রকাশের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ সময় তিনি জানান, জাতীয় শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের কাজ চলমান রয়েছে। আগামী বছর শিক্ষাক্রমে চারটি নতুন বিষয় যুক্ত করা হবে। আর ২০২৮ সাল থেকে সংশোধিত শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

শিক্ষা খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী উপস্থিত ছিলেন।