জাপানের সঙ্গে ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, ২ লাখ কর্মসংস্থানের আশা: তারেক রহমান

Shahinur Rahman Uzzol
Shahinur Rahman Uzzol Shahinur Rahman Uzzol
প্রকাশিত: ১২:২১ পূর্বাহ্ন, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১:৪৯ অপরাহ্ন, ২৮ অক্টোবর ২০২৬


জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, উচ্চগতির রেল ও শিল্পায়নে সহযোগিতা জোরদারে ঢাকা-টোকিওর আলোচনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ কোটি ইয়েন বা প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সম্ভাব্য এই বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা করা হচ্ছে।

জাপান সফরকে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দুই দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্ব ও কৌশলগত অংশীদারত্বকে বাংলাদেশের জনগণের জন্য বাস্তব ও দৃশ্যমান সুযোগে রূপ দেওয়াই আলোচনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রী জানান, শীর্ষ বৈঠকে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় দুই দেশের অভিন্ন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তায় ৩২ কোটি ডলারের সহায়তা নিয়ে আলোচনা

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে জাপানের ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় ৫ হাজার কোটি জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৩২ কোটি মার্কিন ডলার জরুরি আর্থিক সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে সম্ভাব্য বিনিয়োগ বাংলাদেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব

প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ উদ্যোগের আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন এবং উন্নত প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

এ ছাড়া মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে সহযোগিতা, দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরের মধ্যে উচ্চগতির রেল যোগাযোগ স্থাপন এবং আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

BIG-B উদ্যোগে নতুন সম্ভাবনা

শীর্ষ বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (BIG-B) উদ্যোগকে যৌথ সমৃদ্ধির নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার।

এ উদ্যোগের আওতায় জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগসেতু হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (EPA) দ্রুত বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা জোরদার এবং অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবায়নে মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাপানের সহযোগিতা কামনা

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য জাপানের অব্যাহত মানবিক সহায়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসইভাবে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাপানের অব্যাহত ও সক্রিয় ভূমিকা কামনা করেছেন তিনি।

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর মরহুমা মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জাপান সফর ও দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছিলেন।

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম দিকের দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার বিভিন্ন পর্যায়ে দেশটি বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে থেকেছে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের অগ্রাধিকার

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর বাংলাদেশ নতুনভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তাঁর সরকার বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থবহ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি, জাপান সরকার ও দেশটির জনগণের উষ্ণ আতিথেয়তা এবং বাংলাদেশের প্রতি অব্যাহত আস্থার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তারেক রহমান।

তিনি দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ও জাপান একসঙ্গে কাজ করলে উভয় দেশের জনগণের জন্য আরও শক্তিশালী, উন্নত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।