তারেক রহমান নিজগুণে ভাস্বরঃ তাঁকে ডিগ্রী, বিশ্ববিদ্যালয় বা স্বীকৃতির ক্ষুদ্র গণ্ডিতে বাঁধার চেষ্টা অমূলক" - প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণে একটি নাম অবধারিতভাবে কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে- "তারেক রহমান"। অতি সম্প্রতি তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। তবে একজন রাজনীতি বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, তারেক রহমানের মতো একজন 'ক্যারিসমেটিক' (Charismatic) জননেতাকে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী বা সার্টিফিকেটের মাপকাঠিতে বিচার করার চেষ্টা একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি মাত্র। তিনি তাঁর স্বকীয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের জাদুকরী শক্তিতে আজ "নিজগুণে ভাস্বর" এক মহান রাষ্ট্রনায়ক।
প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার ঊর্ধ্বে নেতৃত্বের ক্যারিশমা
তারেক রহমানের নেতৃত্ব কোনো প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দাস নয়। তাঁর রাজনৈতিক শিক্ষা শুরু হয়েছে ঘর থেকে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শের পথ ধরে। রাজনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং জনগণের সাথে সরাসরি সংযোগ অনেক বেশি কার্যকর। জনাব তারেক রহমান সেই তৃণমূল সংযোগের প্রতীক। তাঁর নেতৃত্ব আজ প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার অতীত এক উচ্চতায় আসীন, যেখানে তাঁর সহজাত 'ক্যারিশমা'ই প্রধান চালিকাশক্তি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি ও প্রতিকূল সময়
অনেকের কৌতূহল মেটাতে তথ্যের প্রয়োজনে উল্লেখ করা যায় যে, তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন। আইন বিভাগে দুই মাস ক্লাস করার পর তিনি বিভাগ পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। দুই বিভাগ মিলিয়ে তাঁর সহপাঠী ছিলেন ১২২ জন, যাঁদের মধ্যে বর্তমান সময়ের অনেক প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব রয়েছেন- যেমন সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন তাঁর শিক্ষা কার্যক্রম সেখানে সমাপ্ত হয়নি? তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল স্বৈরাচার এরশাদ আমলের। অধ্যাপক আসিফ নজরুলের ভাষায়, শহীদ জিয়ার হত্যাকাণ্ডের সাথে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট 'নিরাপত্তা ঝুঁকি'র কারণেই সম্ভবত তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছিল। সুতরাং, তাঁর শিক্ষা জীবন অসম্পূর্ণ থাকার পেছনে মেধার অভাব নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও নিরাপত্তা সংকটই ছিল প্রধান কারণ।
তৃণমূল মনোদৃষ্টি ও জনগ্রহণযোগ্যতা
একজন সফল জননেতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী থাকাটা যতটুকু না জরুরি, তার চেয়ে বেশি জরুরি মানুষের ভাষা এবং মনোবোধ বোঝার ক্ষমতা। তারেক রহমান দীর্ঘ সময় দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর 'তৃণমূল সম্মেলন' কর্মসূচি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন। মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে কোনো একাডেমিক সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় সাহসিকতা ও দায়বদ্ধতার। বিরোধী পক্ষ যখন তাঁর শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তারা আসলে জনমানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়।
রাজনৈতিক বৈধতা ও উত্তরাধিকারের সার্থকতা
জনাব তারেক রহমান জিয়া পরিবারের উত্তরাধিকারী হলেও তিনি আজ নিজের যোগ্যতায় এবং ত্যাগের বিনিময়ে রাজনৈতিক স্থান ও সর্বসাধারণ মানুষের হৃদয়ের ভালবাসা অর্জন করেছেন। প্রায় দু'দশক নির্বাসন ও জুলুম সহ্য করেও তিনি যেভাবে দলকে সুসংগঠিত রেখেছেন, তা তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই প্রমাণ। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, নেতৃত্বের প্রকৃত স্বীকৃতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নয়, বরং আসে জনগণের সমর্থন ও ভালোবাসা থেকে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি'র চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান এমপিকে কোনো ক্ষুদ্র গণ্ডিতে বা প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক ফ্রেমওয়ার্কে আবদ্ধ করার চেষ্টা অমূলক। তিনি এখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক প্রতীকী কণ্ঠস্বর। ডিগ্রি বা স্বীকৃতির ক্ষুদ্র গণ্ডি পেরিয়ে তিনি আজ এক 'লার্জার দ্যান লাইফ' চরিত্রে রূপান্তরিত হয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দিগন্তে তাঁর এই অবস্থান কেবল বাস্তবসম্মত নয়, বরং যৌক্তিক ও অপরিহার্য। সমকালীন রাজনীতিতে তাঁর ক্যারিসমেটিক নেতৃত্বের সুপ্রভাব আগামী দিনে আরও সুদূরপ্রসারী হবে- এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।