সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, সম্মান ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি

Newsdesk
Newsdesk Newsdesk
প্রকাশিত: ৫:৩০ অপরাহ্ন, ১১ মে ২০২৬ | আপডেট: ১০:৪২ অপরাহ্ন, ১১ মে ২০২৬


বাংলাদেশে গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকরা সমাজের চোখ ও বিবেক হিসেবে কাজ করেন। দেশের সমস্যা, সম্ভাবনা, দুর্নীতি, অন্যায়, অনিয়ম ও জনদুর্ভোগের চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরেন তারাই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, যারা সমাজের জন্য নিরলসভাবে কাজ করেন, সেই সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ আজ নিরাপত্তাহীনতা, অবমূল্যায়ন ও অধিকার বঞ্চনার শিকার।

বর্তমান সময়ে সাংবাদিকদের পেশাগত ঝুঁকি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক হামলা, হুমকি, মামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। স্থানীয় পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের অবস্থা আরও বেশি উদ্বেগজনক। অনেক সময় প্রভাবশালী মহলের অনিয়ম বা দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করায় তাদের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ চাপ। কোথাও শারীরিক হামলা, কোথাও মিথ্যা মামলা, আবার কোথাও প্রাণনাশের হুমকি—এসব যেন এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম গড়ে তুলতে হলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ একজন ভীত সাংবাদিক কখনোই স্বাধীনভাবে সত্য প্রকাশ করতে পারেন না। যখন একজন সংবাদকর্মী নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকেন, তখন তার পক্ষে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু তাদের ব্যক্তিগত অধিকার নয়, এটি একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেরও প্রয়োজন।

নিরাপত্তার পাশাপাশি সাংবাদিকদের সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে এখনও অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রতি অবহেলা বা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। অথচ একজন প্রকৃত সাংবাদিক রাষ্ট্র ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গঠন, জনগণের অধিকার আদায় এবং সচেতনতা তৈরিতে সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিসীম। তাই তাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশের অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাংবাদিকরা এখনও ন্যায্য বেতন ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অনেকেই নিয়মিত বেতন পান না, নেই চাকরির নিশ্চয়তা কিংবা স্বাস্থ্যসেবা ও বীমা সুবিধা। বিশেষ করে স্থানীয় ও অনলাইন সাংবাদিকদের দুর্দশা সবচেয়ে বেশি। অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রম আইন বা ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন করে না। ফলে সাংবাদিকদের জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা পেশাগত মান ও স্বাধীনতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বর্তমান বাস্তবতায় সাংবাদিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। প্রথমত, সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা আইন ও সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সকল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন, সময়মতো বেতন প্রদান এবং চাকরির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা, কল্যাণ তহবিল ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে।

মনে রাখতে হবে, শক্তিশালী গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। আর নিরাপদ, সম্মানিত ও অধিকারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ছাড়া শক্তিশালী গণমাধ্যম গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। তাই রাষ্ট্র, গণমাধ্যম মালিক, প্রশাসন ও সমাজের সকল শ্রেণিকে সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

সত্য ও ন্যায়ের পথে যারা কলম ধরেন, তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা জাতির দায়িত্ব। কারণ সাংবাদিকদের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ ও রাষ্ট্র। তাই এখনই সময়—সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, সম্মান ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।


সাংবাদিক শেখ মো শাহিনুর রহমান উজ্জ্বল 

লেখক ও কলামিস্ট