যেখান থেকে সপ্তম আসমানে যাত্রা শুরু করেছিলেন মহানবী (সা.)

Shahinur Rahman Uzzol
Shahinur Rahman Uzzol Shahinur Rahman Uzzol
প্রকাশিত: ৬:৩৪ অপরাহ্ন, ১২ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৩:২২ অপরাহ্ন, ১৯ জুন ২০২৬


মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর ও অলৌকিক ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মেরাজ। এটি শুধু একটি আধ্যাত্মিক সফর নয়, বরং আল্লাহর অসীম ক্ষমতা এবং নবী করিম (সা.)-এর মর্যাদার এক অনন্য নিদর্শন। ইসলামী ইতিহাস অনুযায়ী, মহানবী (সা.) পৃথিবী থেকে আসমানের পথে যে মহিমান্বিত যাত্রা করেছিলেন, তার সূচনা হয়েছিল পবিত্র জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ থেকে।

ইসরা ও মেরাজের প্রেক্ষাপট

নবুওয়াতের দশম বছর মহানবী (সা.)-এর জীবনে নেমে আসে এক কঠিন সময়। প্রিয় স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালিবের মৃত্যুতে তিনি গভীরভাবে শোকাহত হন। ইতিহাসে এই বছরটি “আমুল হুযন” বা দুঃখের বছর নামে পরিচিত। ঠিক এমন সময় আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসূলকে এক মহিমান্বিত সফরের মাধ্যমে সান্ত্বনা ও সম্মান দান করেন।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

“পবিত্র ও মহান সেই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন, যার চারপাশ আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাঁকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাতে পারি।”

— (সূরা আল-ইসরা: ১)

মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা

মেরাজের সূচনায় মহানবী (সা.) পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে বোরাক নামক এক বিশেষ বাহনে আরোহণ করে জেরুজালেমে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ-এ পৌঁছান। সেখানে তিনি পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলের ইমামতি করে নামাজ আদায় করেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, তিনি সকল নবীর নেতা ও সর্বশেষ রাসূল।

যে স্থান থেকে শুরু হয়েছিল সপ্তম আসমানের যাত্রা

ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণের একটি পবিত্র স্থান থেকে মহানবী (সা.)-এর আসমানি সফর শুরু হয়। ঐতিহাসিকভাবে এই স্থানটি “সাখরা” বা “পবিত্র শিলা” নামে পরিচিত। মুসলমানদের বিশ্বাস, এখান থেকেই মহানবী (সা.) হযরত জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে আসমানের দিকে যাত্রা করেন।

বর্তমানে এই পবিত্র শিলার উপর নির্মিত রয়েছে ডোম অব দ্য রক, যা ইসলামের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। যদিও এটি কোনো মসজিদ নয়, তবুও মেরাজের স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবে বিশ্ব মুসলিমের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত।

সাত আসমানে নবী (সা.)-এর সফর

মহানবী (সা.) আসমানের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

প্রথম আসমানে — হযরত আদম (আ.)

দ্বিতীয় আসমানে — হযরত ঈসা (আ.) ও হযরত ইয়াহইয়া (আ.)

তৃতীয় আসমানে — হযরত ইউসুফ (আ.)

চতুর্থ আসমানে — হযরত ইদরিস (আ.)

পঞ্চম আসমানে — হযরত হারুন (আ.)

ষষ্ঠ আসমানে — হযরত মূসা (আ.)

সপ্তম আসমানে — হযরত ইবরাহিম (আ.)

প্রতিটি আসমানে তিনি নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন।

সিদরাতুল মুনতাহা ও আল্লাহর সান্নিধ্য

সপ্তম আসমান অতিক্রম করে মহানবী (সা.) পৌঁছান “সিদরাতুল মুনতাহা”-য়, যা সৃষ্টিজগতের সর্বোচ্চ সীমার প্রতীক। সেখানে এমন কিছু রহস্য ও নিদর্শন তাঁকে দেখানো হয়, যা মানুষের ভাষায় সম্পূর্ণভাবে বর্ণনা করা সম্ভব নয়।

এই মহিমান্বিত সফরেই উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ নির্ধারিত হলেও পরবর্তীতে তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত করা হয়, যদিও সওয়াব পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান রাখা হয়।

মেরাজের শিক্ষা

মেরাজের ঘটনা মুসলমানদের জন্য বহু শিক্ষা বহন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

১. আল্লাহর ক্ষমতার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখা।

২. নামাজের গুরুত্ব উপলব্ধি করা।

৩. কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করা।

৪. নবী করিম (সা.)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া।

৫. আখিরাতের জীবনের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা।


পবিত্র আল-আকসা মসজিদ থেকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সপ্তম আসমানের পথে যাত্রা ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য অলৌকিক ঘটনা। এই সফর মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে আল্লাহর ক্ষমতার কোনো সীমা নেই এবং তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য তিনি এমন সম্মান ও মর্যাদার ব্যবস্থা করতে পারেন যা মানুষের কল্পনারও ঊর্ধ্বে। মেরাজ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি ঈমান, ইবাদত, ধৈর্য এবং আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থার এক চিরন্তন শিক্ষা।


সম্পাদনায় শেখ মো শাহিনুর রহমান উজ্জ্বল 

সিনিয়র সাংবাদিক