বিটিসিএল-এর রাঘববোয়াল গিয়াস উদ্দিনের সিন্ডিকেট রাজত্ব, ফুঁসে উঠছে সাধারণ কর্মীরা

Newsdesk
Newsdesk Newsdesk
প্রকাশিত: ৩:৫৭ অপরাহ্ন, ২৮ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৭:৩২ অপরাহ্ন, ২৮ জুন ২০২৬


​বিশেষ প্রতিবেদক

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) যেন অনিয়ম, চরম স্বেচ্ছাচারিতা আর দুর্নীতির এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। খোদ সরকারপ্রধান ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং কর্মচারীদের নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য বারবার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও, বিটিসিএলের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সেই নির্দেশকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করছে না। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম মূল হোতা এবং শীর্ষ তালিকাভুক্ত দুর্নীতিবাজ কর্মচারী হলেন মো. গিয়াস উদ্দিন। প্রধান কার্যালয়ের কিছু অসাধু ও নীতিহীন কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের অনৈতিক রাজত্ব টিকিয়ে রেখেছেন। কর্মস্থলে না গিয়েও মাসের পর মাস সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা তুলে নেওয়া এবং ঢাকায় বসে অবৈধ দালালি চক্র নিয়ন্ত্রণ করাই এখন তার মূল পেশা।  

​গিয়াস উদ্দিনের এই সুসংগঠিত অপরাধ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুক্তি ও তথ্যভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পয়েন্টগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

​১. প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনাকে সরাসরি অবজ্ঞা ও ঔদ্ধত্য

​বর্তমান সরকার দেশের সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে শতভাগ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অথচ গিয়াস উদ্দিনের মতো প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজরা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এই রাষ্ট্রীয় আদেশকে প্রকাশ্যেই বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছেন। এটি শুধু এক ব্যক্তির অপরাধ নয়, বরং খোদ সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রতি এক চরম ঔদ্ধত্য এবং চপেটাঘাত।  

​২. দুর্গম এলাকায় বদলি এড়াতে প্রতারণা ও ঢাকায় বিলাসী অবস্থান

​বিটিসিএল-এর সূত্র অনুযায়ী, গত ২০ জানুয়ারি এক বিশেষ আদেশে মো. গিয়াস উদ্দিনসহ আরও বেশ কয়েকজন সিন্ডিকেট সদস্যকে তাদের দুর্নীতির শাস্তিস্বরূপ ঢাকার বাইরে পার্বত্য অঞ্চল রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি কিংবা সুনামগঞ্জের মতো প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক এলাকায় বদলি করা হয়েছিল। কৌশলগত কারণে তারা কাগজে-কলমে নতুন কর্মস্থলে যোগদান দেখালেও, বাস্তবে একদিনের জন্যও নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে পা রাখেননি। গিয়াস উদ্দিন তার কর্মস্থল রাঙামাটি বা খাগড়াছড়িতে যোগ না দিয়ে অবৈধভাবে ঢাকার গুলশান (পশ্চিম) এলাকার মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও বিলাসবহুল স্থানে আয়েশি জীবন যাপন করছেন, যা একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারীর বৈধ আয়ের সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ।  

​৩. কাজ না করে 'ভূতুড়ে' হাজিরায় রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ

​সরকারি নিয়ম অনুযায়ী "নো ওয়ার্ক, নো পে" (কাজ নেই তো বেতন নেই) নীতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও গিয়াস উদ্দিনের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ উল্টো। কর্মস্থলে কোনো ধরনের দায়িত্ব পালন না করে এবং হাজিরা খাতা বা ডিজিটাল রেজিস্ট্রিতে কোনো উপস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও, তিনি প্রতি মাস শেষে নিয়মিতভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মোটা অঙ্কের বেতন ও উৎসব ভাতা পকেটে পুরছেন। এই ধরনের জালিয়াতি দেশের সাধারণ করদাতাদের টাকার ওপর এক নির্মম ও প্রকাশ্য ডাকাতি।  

​৪. পর্দার আড়ালে কোটি কোটি টাকার 'বদলি বাণিজ্য' সিন্ডিকেট

​অনুসন্ধানে জানা গেছে, গিয়াস উদ্দিন শুধু নিজেই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন না, বরং তিনি বিটিসিএলের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী 'বদলি বাণিজ্য ও তদবির সিন্ডিকেট' গড়ে তুলেছেন। প্রধান কার্যালয়ের অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে আঁতাত করে মোটা অঙ্কের অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে যেকোনো কর্মচারীর বদলি বাতিল করা, ঢাকার ভেতরে পছন্দের জায়গায় পদায়ন করা কিংবা অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার পেছনে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করে এই গিয়াস উদ্দিন চক্র।  

​৫. রহস্যময় ক্ষমতার উৎস ও স্থানীয় প্রশাসনের লাচারি

​পার্বত্য অঞ্চলের ডিজিএম (টেলিকম) শিশির কুমার চক্রবর্তীর মতো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে, তারাও গিয়াস উদ্দিনের এই দীর্ঘমেয়াদী এবং নিয়মবহির্ভূত অনুপস্থিতির কোনো যৌক্তিক বা আইনি ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। কোনো প্রকার অনুমোদিত ছুটি ছাড়া একজন সাধারণ কর্মচারী কীভাবে মাসের পর মাস ঢাকায় বসে কাটানো সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় না—তা এখন বিটিসিএলের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে বড় ধরনের ক্ষোভ ও রহস্যের জন্ম দিয়েছে।  

​৬. প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ধ্বংস ও সাধারণ কর্মচারীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ

​গিয়াস উদ্দিনের মতো দুর্নীতিবাজদের এমন প্রকাশ্য ছাড় দেওয়ার কারণে বিটিসিএলের সৎ ও সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ এবং হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। আইন সবার জন্য সমান না হওয়ায় এবং অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চেইন অব কমান্ড বা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।  

​যৌক্তিক প্রশ্ন ও অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি:

আজকে বিটিসিএলের সাধারণ কর্মী ও সচেতন নাগরিক সমাজের একটাই প্রশ্ন—আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে এই মো. গিয়াস উদ্দিনকে আড়াল করা এই 'অদৃশ্য' শক্তির উৎস আসলে কোথায়? কিসের জোরে তিনি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র এবং প্রশাসনিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন?  

​একটি স্বায়ত্তশাসিত ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানকে কতিপয় দালালের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে এই গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় মামলা দায়ের, তার অবৈধভাবে উত্তোলিত সরকারি অর্থ বাজেয়াপ্তকরণ এবং তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এখনো চোখ বন্ধ করে থাকে, তবে বিটিসিএল-এর মতো একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান অচিরেই সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পতিত হবে।