হলুদ সাংবাদিকতা কী? -----শেখ মো শাহিনুর রহমান উজ্জ্বল
সাংবাদিকতা সমাজের দর্পণ। মানুষের সামনে সত্য, তথ্য ও বাস্তব ঘটনাকে নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু যখন সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের পরিবর্তে পাঠকের কৌতূহল বাড়ানো, চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা, জনপ্রিয়তা অর্জন কিংবা কোনো বিশেষ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে সংবাদকে অতিরঞ্জিত, বিকৃত বা একপেশেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তখন তাকে সাধারণভাবে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ বলা হয়।
হলুদ সাংবাদিকতায় সংবাদ পরিবেশনের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। ফলে কোনো ঘটনার প্রকৃত গুরুত্বের চেয়ে তার চটকদার দিককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্য, যাচাই-বাছাইহীন বক্তব্য, গুজব কিংবা অনুমানকেও সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে পাঠক বা দর্শকের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে এবং সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হলুদ সাংবাদিকতার প্রধান বৈশিষ্ট্য
উস্কানিমূলক ও চটকদার শিরোনাম:
পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অনেক সময় এমন শিরোনাম ব্যবহার করা হয়, যা সংবাদটির প্রকৃত তথ্যের তুলনায় অনেক বেশি উত্তেজনাপূর্ণ। শিরোনাম দেখে পাঠকের যে ধারণা তৈরি হয়, মূল প্রতিবেদনে তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নাও থাকতে পারে। বর্তমানে অনলাইন সাংবাদিকতায় এ ধরনের প্রবণতাকে অনেক সময় ‘ক্লিকবেইট’ শিরোনাম বলা হয়।
সংবেদনশীলতা ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি:
কোনো ঘটনার সামাজিক গুরুত্বের চেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ বা আবেগঘন দিককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হলুদ সাংবাদিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ছোট কোনো ঘটনাকেও এমনভাবে উপস্থাপন করা হতে পারে, যাতে তা বড় ধরনের সংকট বা বিতর্ক হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
তথ্য যাচাই না করা:
সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিগুলোর একটি হলো তথ্য যাচাই। কিন্তু হলুদ সাংবাদিকতায় অনেক সময় একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য যাচাই না করেই সংবাদ প্রকাশ করা হয়। ফলে ভুল তথ্য, গুজব কিংবা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য সংবাদে স্থান পেতে পারে।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ:
কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক বিষয় বা ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রকাশ করে পাঠকের আগ্রহ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হতে পারে। জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকা ব্যক্তিগত বিষয়কে সংবাদে পরিণত করা সাংবাদিকতার নৈতিকতার প্রশ্ন তৈরি করে।
অতিরঞ্জন ও বিকৃতি:
ঘটনার প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে অতিরিক্ত বিশেষণ, অনুমান বা নাটকীয়তা যুক্ত করে সংবাদকে আকর্ষণীয় করে তোলাও হলুদ সাংবাদিকতার একটি প্রবণতা। এতে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আড়াল হয়ে যেতে পারে।
হলুদ সাংবাদিকতার ক্ষতিকর প্রভাব
হলুদ সাংবাদিকতার প্রভাব শুধু একটি সংবাদ বা একটি গণমাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ভুল বা অতিরঞ্জিত সংবাদ দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক কিংবা ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যাচাইহীন তথ্য প্রকাশ হলে তার সামাজিক ও পেশাগত সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে ধর্ম, রাজনীতি, অপরাধ, সাম্প্রদায়িকতা, ব্যক্তিগত চরিত্র কিংবা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবেদনশীল বিষয়ে দায়িত্বহীন সংবাদ পরিবেশনের ফল আরও গুরুতর হতে পারে। তাই এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং ভাষা ব্যবহারে বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অনলাইন সাংবাদিকতায় নতুন চ্যালেঞ্জ
ডিজিটাল যুগে সংবাদ প্রকাশের গতি অনেক বেড়েছে। একটি সংবাদ কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভিউ’, ‘শেয়ার’, ‘লাইক’ ও ‘ক্লিক’-এর ওপর গুরুত্ব বাড়ায় কিছু ক্ষেত্রে চটকদার কনটেন্ট তৈরির প্রবণতাও দেখা যায়।
তবে দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতা কখনোই তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তাকে বাতিল করে না। ‘আগে প্রকাশ’ নয়, ‘সঠিকভাবে প্রকাশ’—এটাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মূলনীতি হওয়া উচিত।
দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার করণীয়
হলুদ সাংবাদিকতা প্রতিরোধে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের কিছু মৌলিক নীতি অনুসরণ করা জরুরি। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই, একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র ব্যবহার, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া, মতামত ও তথ্যকে আলাদা রাখা এবং সংবাদে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনাপূর্ণ ভাষা পরিহার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ভুল সংবাদ প্রকাশিত হলে তা সংশোধনের ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকা উচিত। কারণ সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা।
উপসংহার
সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য মানুষের কৌতূহলকে উসকে দেওয়া নয়; বরং মানুষকে সত্য ও প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো। সংবাদ যত আকর্ষণীয়ই হোক, তার ভিত্তি হতে হবে সত্য, তথ্য ও জনস্বার্থ।
হলুদ সাংবাদিকতা সাময়িকভাবে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সাংবাদিকতার মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের কাছে চটকদারির চেয়ে সত্য, দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিকতার শক্তি শব্দে নয়, সত্যে; জনপ্রিয়তায় নয়, বিশ্বাসযোগ্যতায়।
শেখ মো শাহিনুর রহমান উজ্জ্বল
সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদক
ম্যাজিক বাংলা টিভি ডট কম