বিবেকহীন আধুনিকতা: ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি বিপন্ন মানবতা-- ড. আসিফ মিজান
আজ একবিংশ শতাব্দীর চরম উৎকর্ষের যুগে দাঁড়িয়ে আমাদের একটি রূঢ় সত্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে—আমরা প্রযুক্তিতে যতটা এগিয়েছি, মানবিকতায় ঠিক ততটাই পিছিয়েছি। চারপাশের বাহ্যিক চাকচিক্য আর যান্ত্রিক উন্নয়ন দেখে মনে হতে পারে আমরা সভ্যতার চূড়ায় আরোহণ করছি। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম ক্যানভাসে তাকালে দেখা যায়, আমাদের ভেতরের ‘মানুষ’টি দিন দিন এক অনুভূতিহীন রোবটে পরিণত হচ্ছে। মানবতা আজ দিশেহারা হয়ে দিগ্বিদিক ছুটে বেড়াচ্ছে, অথচ একটু আশ্রয় দেওয়ার মতো সহানুভূতিশীল হৃদয়ের বড় অভাব।
সম্প্রতি দেশের কোথাও না কোথাও এমন কিছু মর্মান্তিক দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, যা বিবেকসম্পন্ন যেকোনো মানুষকে স্তব্ধ করে দিতে বাধ্য। স্বামীর কাঁধে স্ত্রীর নিথর লাশ, আর চারপাশের একদল মানুষ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে শুধু তা দেখছে। কেউ একটু এগিয়ে আসছে না, সান্ত্বনার দুটি বাণী কিংবা সহযোগিতার হাতটুকু বাড়াচ্ছে না। এর চেয়েও জঘন্য দৃশ্য দেখা যায় যখন এক হাতে অসুস্থ শিশু ও অন্য হাতে আরেকটি অবুঝ সন্তান নিয়ে এক অসহায় মানুষ সাহায্যের জন্য রাজপথে আর্তনাদ করছে, আর আশেপাশের কিছু মানুষ পকেট থেকে দামি স্মার্টফোনটি বের করে সেই যন্ত্রণার ভিডিও ধারণে ব্যস্ত!
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সস্তা লাইক, কমেন্ট আর ভিউয়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা আজ আমাদের বোধশক্তিকে গ্রাস করে ফেলেছে। একটি মানুষের জীবনের চেয়ে, তার বুকফাটা আর্তনাদের চেয়ে আজ মোবাইল ক্যামেরার লেন্স বড় হয়ে গেছে। মুমূর্ষু মানুষকে বাঁচানোর চেয়ে সেই যন্ত্রণাদায়ক দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করাই যেন বর্তমান সমাজের একটি অংশের প্রধান দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, মানুষের বিবেক আজ কোন অতল গহ্বরে হারিয়ে গেল? কোথায় আজ সেই মানবতার ফেরিওয়ালারা, বিপদে-আপদে যারা অন্যের জন্য নিজের জীবন বাজি রাখতেন?
এই ব্যাধি শুধু কোনো একক ব্যক্তির নয়, বরং পুরো সমাজ ব্যবস্থার নৈতিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। যখন সহানুভূতির চেয়ে যান্ত্রিক প্রদর্শনীবাদ বড় হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে সমাজের ভেতরের কাঠামোটাই পচে গেছে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, তাসের ঘর ভেঙে পড়তে সময় লাগে না। মানবতা যদি পুরোপুরি মারা যায়, তবে সেই সমাজ কখনো টিকে থাকতে পারে না। আজ যে মহামারী বা আকস্মিক বিপদ অন্য কারো দরজায় কড়া নেড়েছে, কাল তা আপনার কিংবা আমার দরজাতেও আসতে পারে। কারণ, বিপর্যয় কখনো কারো অনুমতি নিয়ে বা সময় চেয়ে আসে না।
এখনই সময় এই আত্মকেন্দ্রিকতার দেয়াল ভেঙে ফেলার। ভার্চুয়াল জগতের সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে আমাদের বাস্তব পৃথিবীর রক্ত-মাংসের মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। আসুন, ক্যামেরার লেন্স বন্ধ করে আগে হৃদয়ের চোখটা খুলি। মানুষের বিপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। কারণ দিনশেষে মানুষ মানুষের জন্যই, আর এই সত্যটি ভুলে গেলে আমাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে।