সাদা পাথর আল্লাহ কেন সৃষ্টি করেছেন?

Newsdesk
Newsdesk Newsdesk
প্রকাশিত: ১২:১৪ অপরাহ্ন, ২২ মে ২০২৬ | আপডেট: ১২:২৩ পূর্বাহ্ন, ২৩ মে ২০২৬

বিশ্বজগতের প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে রয়েছে এক মহাকালের রহস্য। মহাবিশ্বের সবকিছু এক আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে, যার ইশারায় প্রতিটি কণা পরিচালিত হয়। তাঁর মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করে আসমান, জমিন এবং তার মাঝে যা কিছু আছে, যদিও তাদের সেই তাসবিহ আমাদের ইন্দ্রিয়ের বাইরে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, সাত আসমান ও জমিন এবং এগুলোর অন্তর্বর্তী সবকিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং এমন কিছু নেই, যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না; কিন্তু তাদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা তোমরা বুঝতে পার না; নিশ্চয় তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ। (সুরা বনি ইসরাঈল,  ৪৪)

এই রহস্যময় সৃষ্টিজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো পাথর, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য। আল্লাহতায়ালা এই পাথর দিয়েই পৃথিবীর বুকে বিশাল অট্টালিকা গড়েছেন। আবার এই পাথরকেই বান্দার পাপমোচনের মাধ্যম বানিয়েছেন। হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হাজরে আসওয়াদ একটি জান্নাতি পাথর, তার রং দুধের চেয়ে বেশি সাদা ছিল। এর পর বনি আদমের পাপরাশি এটিকে কালো বানিয়ে দিয়েছে।’ (জামে তিরমিজি, ৮৭৭; মুসনাদে আহমাদ, ১/৩০৭, ৩২৯)

এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, কাল পাথরটি কাবা ঘরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি স্পর্শ বা চুম্বন করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে গুনাহ মাফ হয়। হাজরে আসওয়াদের একটি জিহ্বা ও দুটি ঠোঁট রয়েছে, যে ব্যক্তি তাকে চুম্বন বা স্পর্শ করল কেয়ামতের দিন সে তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে।

আবার আল্লাহতায়ালা এই কঠিন পাথরের বুক চিড়েই মানুষের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছেন। যেমনটা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে, আর স্মরণ করো, যখন মুসা তার জাতির জন্য পানি চাইলেন। আমি বললাম, আপনার লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করুন। ফলে তা হতে বারোটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হলো। প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ পানি গ্রহণের স্থান জেনে নিল। (বললাম) আল্লাহর দেওয়া জীবিকা থেকে তোমরা খাও, পান করো এবং জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়িয়ো না। (সুরা বাকারা, ৬০)

তবে পাথরের ব্যবহার শুধু কল্যাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এর মাধ্যমে অবিশ্বাসীদের জন্য জাহান্নামের আগুনকে প্রজ্বলিত করার ব্যবস্থা রেখেছেন। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, অতএব যদি তোমরা তা করতে না পারো আর কখনই তা করতে পারবে না, তা হলে তোমরা সে আগুন থেকে বাঁচার ব্যবস্থা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে অবিশ্বাসীদের জন্য। (সুরা বাকারা, ২৪)

সাধারণ দৃষ্টিতে পাথর একটি প্রাণহীন জড়বস্তু, যার বোধশক্তি, কথা বলার বা শোনার ক্ষমতা নেই। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে এই পাথরই কথা বলতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একাধিক হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। আলি ইবনে আবু তালিব (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে মক্কার কোনো একপ্রান্ত দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন যেকোনো পাহাড় বা গাছের নিকট দিয়ে গেলে তারা তাঁকে ‘আসসালামু আলাইকুম ইয়া রাসুলুল্লাহ’ বলে অভিবাদন জানাত। (তিরমিজি, ৩৬২৬)

ভবিষ্যতেও পাথরের এমন বিশেষ ভূমিকা থাকবে। শেষ যুগে যখন মুসলমান ও ইহুদিদের মধ্যে যুদ্ধ হবে, তখন পাথরও কথা বলবে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা এবং ইহুদি সম্প্রদায় পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হবে। অবশেষে পাথর বলবে, হে মুসলিম, এই যে আমার পেছনে ইহুদি লুকিয়ে আছে, এসো তুমি তাকে হত্যা করো।(মুসলিম, ৭২২৭)

পাথর শুধু কথা বলে না, আমাদের প্রতিটি কাজের নীরব সাক্ষীও। মহান আল্লাহর অন্য সৃষ্টির মতো এই পাথরও আমাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে এবং পরকালে আমাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। আবদুর রহমান বিন আবু সাসাআহ থেকে বর্ণিত, আবু সাঈদ (রা.) বলেছেন, যখন তুমি কোনো জনশূন্য স্থানে আজান দেবে, তখন সেই আজান যে জিন, মানুষ, বৃক্ষলতা বা পাথর শুনবে, কিয়ামতের দিন সে তোমার জন্য সাক্ষ্য দেবে। (ইবনে মাজাহ, ৭২৩)

সুবহানাল্লাহ! এভাবেই মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সৃষ্টিকে আমাদের খেদমতে নিয়োজিত রেখেছেন। আমাদের উচিত তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর শুকরিয়া আদায় করা। অন্যথায় এই সৃষ্টিগুলোই আমাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। আসুন, আমরা আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করি এবং তাঁর দেওয়া প্রতিটি নিয়ামতের সঠিক ব্যবহার করি।