নীরবতা ভাঙলেন দীপেন দেওয়ান, পার্বত্যবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান
পদত্যাগের দুইদিন পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রীর দীপেন দেওয়ান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি পার্বত্য অঞ্চলের জনগণকে শান্ত ও সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত সোমবার (১ জুন) মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন দীপেন দেওয়ান। এরপর রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে তাঁর সমর্থকরা মিছিল, সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় তাঁর নীরবতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও জল্পনা তৈরি হয়।
দীপেন দেওয়ানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করার পরামর্শ পেয়েছিলেন তিনি। তবে বুধবার (৩ জুন) রাতে সেই নীরবতা ভেঙে ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন সাবেক এই মন্ত্রী।
পার্বত্যবাসীকে ধৈর্য ধারণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি লেখেন, “প্রিয় পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণ, আসসালামালাইকুম, ঝু ঝু, নমস্কার, কুলুংকা, রিকোবায়া। সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে আমার পদত্যাগকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে যে আবেগ, উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, সে বিষয়ে আমি গভীরভাবে অবগত রয়েছি।”
আইন-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও লেখেন, “আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল পাহাড়ি, বাঙালি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ভাই-বোনদের প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছি যে, আপনারা শান্ত থাকুন, ধৈর্য ধারণ করুন এবং আইন-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখুন। কোনো ধরনের উসকানি, বিভ্রান্তি বা সংঘাতের পথে না গিয়ে পারষ্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখুন।”
পার্বত্য চট্টগ্রাম সবার বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের সবার। এই অঞ্চলের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও শান্তি রক্ষার দায়িত্বও আমাদের সবার। পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সকল জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা আরও সুদৃঢ় হোক-এটাই আমার প্রত্যাশা।”
পোস্টে নিজের রাজনৈতিক জীবনের কথাও তুলে ধরেন দীপেন দেওয়ান। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে তিনি লেখেন, “আমি গর্বের সঙ্গে স্মরণ করছি যে, আমার বাবা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একজন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার আদর্শ, দেশপ্রেম ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা আমার রাজনৈতিক জীবনের প্রেরণা।”
বিএনপিতে যোগদানের পটভূমি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “আমি দেশনেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্নেহ, দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগদান করেছি। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আমি বিএনপির একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে কাজ করে আসছি।”
বিএনপির প্রতি অটল থাকার ঘোষণা দিয়ে দীপেন দেওয়ান লেখেন, “আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আমার রাজনৈতিক আদর্শের ঠিকানা। আমি জীবনের অবশিষ্ট সময়ও এই প্রিয় দল, এর আদর্শ এবং দেশের জনগণের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে যেতে চাই। ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক যেকোনো পরিস্থিতিতেই আমি দলের প্রতি আমার আনুগত্য ও অঙ্গীকার অটুট রাখব। এই দল আমি কখনো ত্যাগ করব না।”
ঐক্য ও সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ব্যক্তি নয়, জনগণের কল্যাণই সবচেয়ে বড় বিষয়। তাই আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জনগণের কাছে আবারও আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকুন। মত-পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু বিভেদ নয়, প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, কিন্তু সংঘাত নয়।”
শান্তিপূর্ণ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি লেখেন, “আমার একান্ত কামনা, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার পাহাড়ি-বাঙালি সকল সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করুক, উন্নয়নের সুফল ভোগ করুক এবং এই অঞ্চল সম্প্রীতি, স্থিতিশীলতা ও শান্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে উঠুক।”
পোস্টের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতিও আস্থা প্রকাশ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করে দীপেন দেওয়ান বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান নেতৃত্বের প্রতি আমি পূর্ণ আস্থাশীল, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এগিয়ে যেতে চাই। আমি আবারো দীপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করছি- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আমার শেষ ঠিকানা।”
ফেসবুক পোস্ট প্রকাশের পর দীপেন দেওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মোবাইল ফোনে সাড়া পাওয়া যায়নি।
১৯৬৩ সালের ৮ জুন রাঙামাটির রাঙাপানি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন দীপেন দেওয়ান। তাঁর বাবা সুবিমল দেওয়ান শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপজাতীয় বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি আসন থেকে ২ লাখ ১ হাজার ৮৪৪ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।