৪৮ বছর পর ইসলামাবাদে এক টেবিলে বসছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া যুদ্ধবিরতির আলোচনার দিকে এখন পুরো বিশ্বের নজর। দীর্ঘ ৪৮ বছরের মধ্যে এবারই প্রথমবারের মতো দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি আলোচনায় বসছেন। তবে হঠাৎ করে যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটার সিদ্ধান্ত কেন এই প্রশ্নটি বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সামরিক কৌশল, হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং দেশটির জনগণের জাতীয় ঐক্য এসব কারণেই যুদ্ধের মোড় ঘুরেছে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল কোণঠাসা অবস্থায় পড়েছে।
ইরান যুদ্ধের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। তবে ইতিবাচক দিক হলো, আগ্রাসনের পথ থেকে সরে এসে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির আলোচনায় বসতে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে, গত প্রায় পাঁচ দশকের মধ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে এটিই হবে প্রথম সরাসরি রাজনৈতিক বৈঠক।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামরিক, কৌশলগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই এই যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ এসেছে। তবে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল করতে হলে উভয় পক্ষের শর্ত বিবেচনায় নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো জরুরি।
এবারের যুদ্ধে ইরানের সামরিক বাহিনীর শক্ত প্রতিক্রিয়া ওয়াশিংটন ও তেল আবিবে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে দীর্ঘদিনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মৃত্যু হলে দ্রুতই ইরানের সরকার ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, তেহরান দৃঢ়ভাবে অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এছাড়া হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে দীর্ঘ সময় কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকায় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করতে পারে এমন আশঙ্কাও জোরালো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।
অন্যদিকে, নানা চাপ ও ষড়যন্ত্রের মধ্যেও ইরানের জনগণের সরকারের প্রতি আস্থা ও জাতীয় ঐক্য যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
উল্টো দিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে আগ্রাসনে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। এতে দেশটির ভেতরে রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইরানের সমর্থনে বিক্ষোভও দেখা যায়। ইউরোপ ও ন্যাটোর দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে না জড়ানোয় যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই একা হয়ে পড়ে।
এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও তেল স্থাপনায় ইরানের হামলা অব্যাহত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সব মিলিয়ে দীর্ঘ সময়ের এই সংঘাত ইরানকে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।